বুধবার আইএমএফের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে তাদের একটি প্রতিনিধিদল শিগগিরই বাংলাদেশ সফরে আসার পরিকল্পনা করছে।
আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজ শুরু করলেও সামনে এখনো অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
বিশেষ করে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আদায়ের নিম্নমুখী প্রবণতা অর্থনীতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে শুধু নতুন উদ্যোগ নয়, অতীতে শুরু হওয়া সংস্কার কার্যক্রমও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সংস্থাটির মতে, অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফিরিয়ে আনতে হলে সংস্কারকে আরও বাস্তবসম্মত, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি করতে হবে।
আইএমএফ জানিয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংস্কার কার্যক্রমকে সহায়তা করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার নতুন ঋণ কর্মসূচির অধীনে আর্থিক সহায়তা চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে।
এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফের একটি মিশন বাংলাদেশে এসে অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করবে। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করে সংস্কারের অগ্রাধিকার, সম্ভাবনা এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো মূল্যায়ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফর ভবিষ্যৎ ঋণ কর্মসূচির কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের তিনটি বড় ঋণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। এগুলো হলো বর্ধিত ঋণ সহায়তা, বর্ধিত তহবিল সহায়তা এবং স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচি।
এই তিন কর্মসূচির আওতায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়।
তবে বর্তমান সরকার আগের কাঠামোর ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে না গিয়ে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন কর্মসূচির অধীনে সহায়তা নিতে আগ্রহী। সরকার ইতোমধ্যে আইএমএফকে বেশ কিছু সংস্কার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং নীতিগতভাবে সংস্থাটিও নতুন আলোচনা এগিয়ে নিতে সম্মতি জানিয়েছে।
আইএমএফের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
এই পরিবর্তনের ফলে পুরোনো পরিকল্পনার অনেক বিষয় নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তাই বর্তমান বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে নতুন একটি সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংস্থাটি আশা করছে, নতুন কর্মসূচি বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার ও চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত করবে।
আইএমএফ মনে করছে, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। ফলে এই খাতে নতুন নীতি ও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর ও বাজারভিত্তিক করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে বাস্তবভিত্তিক সংস্কারের প্রয়োগ জরুরি।
নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ কত অর্থ সহায়তা পেতে পারে, সে বিষয়ে আইএমএফ এখনো কোনো পরিমাণ উল্লেখ করেনি।
তবে অর্থনীতিবিদদের ধারণা, সাম্প্রতিক সময়ে টাকার উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়নের কারণে আগের তুলনায় বড় অঙ্কের ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
জুলাই মাসে আইএমএফের প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের সময় এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আগামী কয়েক মাস গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে; অন্যদিকে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা।
নতুন ঋণ কর্মসূচি শুধু অর্থ সহায়তার বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ রূপরেখাও নির্ধারণ করতে পারে। ফলে সরকার ও আইএমএফের আসন্ন আলোচনা দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

