সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে আবারও আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে প্রস্তুতি চললেও এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য বলছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একবারে পুরো বেতন বৃদ্ধি না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ রাখার চিন্তাভাবনা চলছে। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি, তবুও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, বাজারে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আবাসন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে বিদ্যমান বেতন কাঠামো দিয়ে সংসার চালানো আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেল শুধু একটি বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, নতুন কাঠামো তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি বড় অংশ বৃদ্ধি করা হতে পারে, যা বর্তমান মূল বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে পরবর্তী অর্থবছরে বাকি বেতন সমন্বয় সম্পন্ন করা হবে। এরপর তৃতীয় ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত এবং অন্যান্য ভাতাগুলো নতুন কাঠামোর আওতায় পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে বেতনের বৈষম্য কিছুটা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান যেখানে ১:৯.৪, সেখানে নতুন কাঠামোয় তা ১:৮-এ নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে আলোচনা চলছে। জানা গেছে, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য পৃথক যাতায়াত ভাতা চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দৈনন্দিন কর্মস্থলে যাতায়াতের ব্যয় কিছুটা হলেও কমবে।
নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীর সংখ্যা শুধু কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীও এর আওতায় আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। বিশেষ করে যেসব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী তুলনামূলক কম পেনশন পান, তাদের জন্য এটি বড় স্বস্তি বয়ে আনতে পারে।
এদিকে বর্তমানে কার্যকর থাকা ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের একটি কমিটি এ বিষয়ে কাজ করছে। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে মহার্ঘ ভাতা পৃথকভাবে থাকবে নাকি মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বিত হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি একদিকে যেমন তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে, অন্যদিকে সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে এটি হবে গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক পরিবর্তন। তবে চূড়ান্ত ঘোষণা, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং বেতন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট হার জানতে এখনো সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন লাখো সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী।

