দেশের রপ্তানি খাতকে আরও গতিশীল করতে এবং নতুন শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে রপ্তানিমুখী সব শিল্পকে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। বর্তমানে এই সুবিধা প্রধানত তৈরি পোশাক শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ভবিষ্যতে অন্যান্য রপ্তানি খাতও একই সুযোগ পাবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গত বুধবার ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভ (ডিএফআই) আয়োজিত প্রাক-বাজেট গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তার মতে, রপ্তানি বাড়ানো, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং অপ্রচলিত শিল্প খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সরকার নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণভিত্তিক একটি বৃহত্তর কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
সভায় মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে যে কোনো রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোক্তা পণ্য রপ্তানি করলে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এটি আর কেবল তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য সংরক্ষিত থাকবে না।
তিনি জানান, স্বর্ণালংকারসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানিকারকরাও বন্ডেড সুবিধার পাশাপাশি ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির সুযোগ কমিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করা হবে।
আমির খসরু বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি বছর বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স নবায়নের বাধ্যবাধকতা থেকে বের করে আনার চিন্তা করছে সরকার। এর পরিবর্তে তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর নিরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বন্ড সুবিধা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বন্ধ করা হবে এবং এ বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে।
সরকার এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে স্বর্ণালংকার উৎপাদন, হীরা প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্ক ও জটিল বিধিনিষেধের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই বিকশিত হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসেবে লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় একক সেবা কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য আবেদন নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি কোম্পানি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সেবা পর্যায়ক্রমে অনলাইনে নেওয়া হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হবে।
ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণকে সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও জটিলতা দীর্ঘদিন ধরে দেশে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়িয়েছে এবং বিনিয়োগের গতি মন্থর করেছে। তিনি আরও জানান, কারুশিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্যে ঢাকার কাছাকাছি ১৬০ একর জমির ওপর একটি সৃজনশীল জেলা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া কর প্রশাসন, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসাসেবা খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর সরকারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরীক্ষার সময় কমানো এবং বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগে অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল বৈঠকে নীতিনির্ধারক, তরুণ উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রক সংস্কার এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিভিন্ন কৌশল নিয়ে মতবিনিময় করেন।

