বাংলাদেশের চামড়া খাতকে ঘিরে বড় ধরনের সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, তৈরি পোশাক খাতে যেখানে মূল্য সংযোজন প্রায় ৬০ শতাংশ, সেখানে চামড়া খাতে তা ৯০ শতাংশেরও বেশি হওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এই খাত গভীর সংকটে রয়েছে। একদিকে চামড়ার ন্যায্য দাম না পেয়ে মানুষ তা ফেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে রপ্তানিকারকেরা বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে চামড়া আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি আয়োজিত এক ওয়েবিনারে। “বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ কি ফিকে হয়ে আসছে?” শীর্ষক এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় গতকাল শনিবার। সভাটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের চামড়া খাত বর্তমানে এক ধরনের আত্মঘাতী অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতে, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর ছিল অসম্পূর্ণ একটি প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে এই স্থানান্তর করা হলেও বাস্তবে বুড়িগঙ্গাও রক্ষা পায়নি, আবার ধলেশ্বরী নদীও দূষণের মুখে পড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তিনি আগামী এক বছরের মধ্যে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর সব কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে চালু করার সুপারিশ করেন।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চামড়া খাতে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। তিনি জানান, বিশ্ববাজারে চামড়া পণ্যের বাজার প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলারের হলেও বাংলাদেশ রপ্তানি করছে মাত্র প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
তাঁর মতে, হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের পরিকল্পনায় বড় ধরনের ভুল ছিল। যেখানে দৈনিক প্রায় ২৫ হাজার কিউসেক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা প্রয়োজন ছিল, সেখানে তৈরি হয়েছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার কিউসেক সক্ষমতা। ফলে দূষণের চাপ এখন বুড়িগঙ্গা থেকে ধলেশ্বরীতে গিয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২০০ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ালেও আন্তর্জাতিক মান অর্জন করা যায়নি।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় বাজারে চামড়া পণ্যের ওপর কার্বন কর আরোপ হতে পারে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ অনেক দেশে শুল্ক সুবিধাও হারাবে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, গত কোরবানির ঈদে প্রায় ৯০ লাখ পশু কোরবানি হলেও ছাগল ও খাসির চামড়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। প্রায় ৬০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। তিনি জানান, ২০১৭ সালে ট্যানারি স্থানান্তরের সময় ছাগলের চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য তৈরি ৩০টি বিশেষায়িত কারখানার মধ্যে মাত্র ৬টি চালু রয়েছে। বাকি ২৪টি বন্ধ রয়েছে।
শাহীন আহমেদ আরও বলেন, কোরবানির মৌসুমে আগে ব্যাংকগুলো প্রায় ৪৬০ কোটি টাকা ঋণ দিত। এখন তা কমে মাত্র ৬৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এই অর্থ সংকটের কারণে ট্যানারি মালিকরা আড়তদার ও প্রান্তিক পর্যায়ে অগ্রিম অর্থ দিতে পারছেন না। এতে বাজারে চামড়া কেনাবেচায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা রপ্তানিকারক সমিতির চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে নির্মিত বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানের পরিবর্তে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ধারণক্ষমতা ও প্রক্রিয়াকরণের সময় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী না হওয়ায় এখনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। এটি রপ্তানির বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেনিস সুজের চেয়ারম্যান নাসির খান বলেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও পরিকল্পনার অভাবে চামড়া খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে হঠাৎ করেই হাজারীবাগের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, যা শিল্পকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কারখানা বন্ধ হওয়ার পরপরই কলকাতায় নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন বলেন, শুধু অর্থায়ন নয়, নীতিগত সমন্বয়ও জরুরি। বর্জ্য শোধনাগার ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে শিল্প মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের সমন্বিত বৈঠক প্রয়োজন।

