বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লবণ শিল্প ক্রমেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চাপে পড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ সময় মেঘলা আবহাওয়া এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে লবণ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে, বাড়ছে কাঁচা লবণের দাম।
লবণ উৎপাদনের জন্য শুষ্ক মৌসুমে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের প্রয়োজন হয়। সাধারণত এপ্রিল ও মে মাসের প্রচণ্ড গরমে লবণ দ্রুত জমে এবং কৃষকেরা ৪ থেকে ৯ দিনের মধ্যে তা সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ওই বছরে লবণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৮ শতাংশ কম হয়েছে। উৎপাদন ঘাটতির কারণে এক বছরের ব্যবধানে কাঁচা লবণের পাইকারি দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দেশে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১ লাখ ৫০ হাজার টন কাঁচা লবণ আমদানির সুপারিশ করেছে।
বিসিকের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একসময় দেশের লবণ শিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়েও বেশি উৎপাদন করত। ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে ৬ লাখ ৩৭ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়েছিল, যেখানে চাহিদা ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার টন।
সে সময় ২০ হাজার ২২৫ জন কৃষক প্রায় ২৬ হাজার ২৮৮ একর জমিতে লবণ চাষ করেছিলেন। প্রতি একরে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ২৪ দশমিক ২৪ টন।
পরবর্তী সময়ে লবণ উৎপাদনের জমি ও কৃষকের সংখ্যা কমতে থাকে। বিশেষ করে কক্সবাজারের মহেশখালী ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামোর মতো বড় প্রকল্প নির্মাণের কারণে অনেক লবণ চাষের জমি হারিয়ে যায়।
শুধু মহেশখালী এলাকাতেই প্রায় ৪ হাজার একর লবণ উৎপাদন জমি অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে কমে গেছে। ২০০৬ অর্থবছরে যেখানে লবণচাষির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৫৭৪ জন, ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৬৯৭ জনে।
তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লবণ উৎপাদনে বড় ধরনের উন্নতি দেখা যায়। ওই বছর ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে ২৪ লাখ ৩৮ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়, যা ছিল ৬২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উৎপাদনের অন্যতম উদাহরণ।
কিন্তু এরপর আবার উৎপাদন কমতে শুরু করে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫১ হাজার টনে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ১৯ লাখ ৪৫ হাজার টনে নেমে আসে।একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতাও কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতি একরে উৎপাদন ছিল ৩৫ দশমিক ৫৯ টন, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে হয়েছে ২৮ দশমিক ৭০ টন।
বিসিকের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে লবণ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে জমি সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বিসিকের ১২টি লবণ কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, ঋণ সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে লবণ উৎপাদনের সময়কাল ছিল ২০৩ দিন। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ২৫ মে পর্যন্ত এই মৌসুম চলে।তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকেরা নিয়মিত মাঠে কাজ করতে পারেননি। বিশেষ করে ২৬ এপ্রিলের পর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে টানা বৃষ্টির কারণে লবণ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মহেশখালীর লবণচাষি সৈয়দ মোস্তফা সাদিক রিজভী জানান, তিনি দুই একর জমিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মণ লবণ উৎপাদন করেছেন। তবে বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই লবণ সংগ্রহ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ওই সময়ে প্রতি কানিতে আরও ১০০ থেকে ১৫০ মণ লবণ উৎপাদন করা সম্ভব হতো।
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাজারেও। বিসিকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কাঁচা লবণের দাম প্রতি মণ ৩৮০ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ২৫৩ টাকা।অর্থাৎ এক মণে দাম বেড়েছে ১২৭ টাকা বা প্রায় ৫০ শতাংশ।
বাংলাদেশ সল্ট মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল কবির বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন কমেছে এবং সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মৌসুমের শেষ দিকে চাহিদা ও সংকটের কারণে দাম বেড়েছে।বাংলাদেশে বছরে লবণের চাহিদা প্রায় ২২ থেকে ২৫ লাখ টন। তবে কাঁচা লবণ প্রক্রিয়াজাত ও আয়োডিনযুক্ত করার সময় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়।
দেশে বছরে ভোজ্য আয়োডিনযুক্ত লবণের চাহিদা ৮ লাখ টনের বেশি। শিল্প খাতে চাহিদা প্রায় ১০ লাখ টন। এ ছাড়া তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ডিটারজেন্ট, কাচ শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে শিল্প লবণের ব্যবহার রয়েছে।দেশে প্রায় ১২০ ধরনের পণ্য উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের লবণের প্রয়োজন হয়। চামড়া শিল্পেও দেশীয় লবণের ব্যবহার রয়েছে।
বর্তমানে দেশে মাসে প্রায় ২ লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়। ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুরোনো ও নতুন মিলে কাঁচা লবণের মজুত ছিল প্রায় ৫ লাখ ২৬ হাজার টন। এর মধ্যে মিল পর্যায়ে মজুত ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন।বিসিক কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান মজুত নতুন মৌসুমের উৎপাদন পুরোপুরি শুরু হওয়া পর্যন্ত চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নাও হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রয়োজন অনুযায়ী এর আগেও কাঁচা লবণ আমদানি করেছে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেড় লাখ টন কাঁচা লবণ আমদানি করা হয়েছিল।বিসিকের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে লবণের দাম বাড়ার সময় আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর প্রবণতা কমে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে বর্তমানে ১ লাখ ৫০ হাজার টন কাঁচা লবণ আমদানির প্রস্তাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।বিসিকের লবণ সেলের প্রধান সরওয়ার আলম বলেন, মৌসুমের শুরুতে উৎপাদন কম থাকে। হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান মজুত নভেম্বর পর্যন্ত চলবে।
তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে সংকট দেখা দিতে পারে।তিনি বলেন, চাহিদা বেশি থাকলে কৃষকেরা অপরিপক্ব লবণ সংগ্রহ করতে পারেন, এতে গুণগত মান কমে এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে ক্ষতি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণ শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় জমি সংরক্ষণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতে এই শিল্পের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

