আগামী বাজেটে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি নিয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাড়তি দামে বিদ্যুৎ ও এলএনজি কিনতে শুধু ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত তিন মাসে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে।
এই লোকসান পূরণে বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেছে বিপিসি। তবে আসন্ন বাজেটে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে ঠিক কত টাকা বরাদ্দ থাকবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকার আপাতত বিপিসিকে কোনো ভর্তুকি দেবে না। তবে এলএনজি আমদানির জন্য গত বছরের মতো ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ রাখা হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই ভর্তুকি আরও বাড়তে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
জানা গেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় যে ৭৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়েছে, তার মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ বিভাগই চেয়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ সচিব মিনারা মাহরুখ বলেন, ভর্তুকি নিয়ে সরকার কাজ করছে। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভর্তুকির কারণে দেশের অর্থনীতি ইতোমধ্যে বড় চাপের মধ্যে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি বাংলাদেশকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তেল, গ্যাস এবং কয়লা আমদানির ব্যয় আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বরাবরের মতো এবারও বাজেটে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করায় সরকারের লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, এবার এই লোকসান বেড়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়ানোর পর রাজস্ব আয় বাড়বে আনুমানিক ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে বাকি ঘাটতির বড় অংশ ভর্তুকি থেকে পূরণ করতে হবে। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয় করে বিতরণ পর্যন্ত আনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৩ টাকা। অথচ গড় বিক্রয় মূল্য ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। ফলে প্রতি ইউনিটে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের হিসাবে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ খরচ দাঁড়াতে পারে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদানিকে দিতে হবে প্রায় ৫ হাজার ৩৫৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বিভিন্ন বেসরকারি কেন্দ্র পাবে ২০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। আরএনপিএল পায়রা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র পাবে ৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা, চীন–বাংলাদেশ পায়রা কেন্দ্র পাবে ৪ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা এবং রামপাল কেন্দ্র পাবে ৪ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জই দাঁড়াচ্ছে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী জুনের মধ্যে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬০০ মেগাওয়াটের ইউনাইটেড আনোয়ারা এবং ৮০০ মেগাওয়াটের রূপসা কেন্দ্রসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প। তবে এসব কেন্দ্র চালুর সময়েও বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে। কারণ চাহিদা থাকলেও গ্যাসের যোগান দিন দিন কমছে।
বিপিসি জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছে, গত তিন মাসে জ্বালানি তেল আমদানি করে তাদের লোকসান হয়েছে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকে বিপিসির জমা অর্থও কমে ৩৮ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৬ থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
চিঠিতে তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—লোকসানের অর্থ ফেরত দেওয়া, অথবা জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি লিটারে এনবিআর কর্তৃক ৩৬ টাকা শুল্ক আদায় বন্ধ রাখা, কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারদরে তেল বিক্রির সুযোগ দিয়ে দাম সমন্বয় করা।
গ্যাস খাতে চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে এলএনজি আমদানির জন্য ২৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রয়োজন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত বছর চাহিদা পূরণে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি এলএনজি আমদানি করতে হয়েছে, যা এবার আরও বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতি ইউনিট গ্যাস ২৬ টাকায় বিক্রি হলেও আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন মিলিয়ে খরচ পড়ছে প্রায় ৩১ টাকা। ফলে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৫ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
এলএনজি আমদানির দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থা আরপিজিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, আগে একটি কার্গো এলএনজি আমদানিতে খরচ হতো প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার, এখন তা বেড়ে প্রায় ৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজির অংশ প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট।
সিভি/এইচএম

