দেশের স্বাস্থ্য খাত এখন এক ধরনের সংকট ও সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে আগের বরাদ্দের বড় অংশই ব্যয় না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কি স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব উন্নয়ন সম্ভব হবে?
সূত্র অনুযায়ী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ খরচ করা সম্ভব হয়েছে। উন্নয়ন ও সেবা সম্প্রসারণের বিপুল সুযোগ থাকলেও বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ অব্যবহৃত থেকে গেছে।
আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তালিকায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে দ্বিতীয় অবস্থানে রাখা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল সপ্তম স্থানে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর আগের বাজেটে, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
নতুন বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের আকার ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। সে হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ বরাদ্দ থাকছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ৪ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সেবার পরিধি বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনবল নিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়, বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যয় করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ওষুধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিকিৎসক জাকির হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বরাদ্দের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই খরচ হয়নি। এমনকি হামের মতো সাধারণ রোগের টিকা পর্যন্ত আমদানি করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, অনেক রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প পরিচালনায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি ও জবাবদিহির অভাবকেই তিনি ব্যয় না হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ফেরত যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। সাধারণ মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ নিজের পকেট থেকে বহন করে। সরকারি অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় না হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বরাদ্দের পাশাপাশি ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বরাদ্দ বাড়ালেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি নিশ্চিত হয় না। বরং মোট বাজেটের অন্তত সাড়ে ৭ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে রাখা এবং তা কার্যকরভাবে ব্যয় করা জরুরি।
স্বাস্থ্য খাত বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বরাদ্দ বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও প্রকৃত পরিবর্তন নির্ভর করবে অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে তার ওপর। না হলে বরাদ্দ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

