মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে আমদানি, পরিশোধন ও বিপণনের একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এখন তীব্র অর্থ সংকটে পড়েছে।
বাজারে বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে সরকার নির্ধারিত কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে। এতে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিন মাসে প্রায় পৌনে তেরো হাজার কোটি টাকার লোকসান: মার্চ থেকে মে পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে বিপিসির মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭৩৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। মাসভিত্তিক লোকসানের হিসাব অনুযায়ী—
- মার্চ মাসে লোকসান ২ হাজার ২৪৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা
- এপ্রিল মাসে লোকসান ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি ৩ লাখ টাকা
- মে মাসে লোকসান ২ হাজার ৬২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা
এই সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা বিপিসির আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট করেছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকায়। অকটেন বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ টাকায়, পেট্রোল ১৪০ টাকায় এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকায় কিন্তু বিপিসির হিসাব অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে প্রতি লিটার ডিজেলের প্রকৃত মূল্য হওয়ার কথা ছিল ১৭৬ টাকা। অর্থাৎ প্রতি লিটার ডিজেলে ৬১ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। একইভাবে অকটেন, পেট্রোল এবং কেরোসিনেও যথাক্রমে ১৬ টাকা, ১৭ টাকা এবং ১৮ টাকা পর্যন্ত কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা শুল্ক ও কর নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরুর আগে এই হার ছিল ১৮ টাকা ৩৬ পয়সা। শুধু ডিজেল আমদানিতেই গত তিন মাসে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হয়েছে। দাম বাড়ার কারণে আগের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা কর দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি।
বিপিসি জানিয়েছে, জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী এলসি খোলার সময় সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়।
কিন্তু বর্তমান অর্থ সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক অগ্রিম টাকা ছাড়া এলসি খুলতে অনীহা দেখাচ্ছে। এতে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়ায় দেরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এলসি খোলা ও অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা জ্বালানি সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে, যা দেশে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে বিপিসির ব্যাংক হিসাবে মোট স্থিতি ছিল ৩১ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে—
- সাধারণ হিসাব ছিল ২৩ হাজার ৮৬৪ কোটি ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮৩ টাকা
- দীর্ঘমেয়াদি এফডিআর ছিল ৫ হাজার ৮৩৪ কোটি ৮০ লাখ ৪১ হাজার ৮৯৬ টাকা
- স্বল্পমেয়াদি এফডিআর ছিল ১ হাজার ৮২৭ কোটি ৯২ লাখ ৮১ হাজার ৬৭৪ টাকা
বিপিসির চিঠি ও তিন দফা প্রস্তাব: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো চিঠিতে বিপিসি ১২ হাজার ৭৩৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকার ভর্তুকি পুনর্ভরণের দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—
- যুদ্ধকালীন সময়ে হওয়া লোকসান ভর্তুকি হিসেবে ফেরত দেওয়া
- সংকটকালীন সময়ে পুরোনো হারে কর ও শুল্ক বহাল রাখা বা অব্যাহতি দেওয়া
- আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিয়মিত জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা
বিপিসি আরও জানিয়েছে, গত ১ জুন ডিজেল ১৭৬ টাকা, অকটেন ১৬১ টাকা, পেট্রোল ১৫৭ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৩ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
বিপিসির পরিচালক (অর্থ) ও সরকারের যুগ্ম সচিব নাজনীন পারভীন বলেন, আমরা সবাই মিলে একটি জাতীয় সংকট মোকাবিলা করছি। তিন মাসে বড় লোকসানের কারণে অর্থ সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে এবং নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট চলছে। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে পুরো ভর্তুকির চাপ বিপিসির ওপর পড়ছে।” তিনি আরও জানান, বিষয়টি বাজেট প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের বাজারে চাপ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, দেশীয় ভর্তুকি চাপ এবং ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে চলতে থাকলে দেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক সহায়তা জরুরি হয়ে উঠেছে।

