নতুন সরকার তাদের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া বাজেটের কিছু অংশ এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে বর্তমান শাসনামলে। সেই অন্তর্বর্তী সরকারও আবার আগের নির্বাচিত সরকারের রেখে যাওয়া বাজেট বাস্তবায়ন করেছিল। মূলত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণেই এই ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের দেওয়া বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্বও তাদের হাতেই থাকে। বিশেষ পরিস্থিতিতে এই ধারা থেকে ব্যতিক্রম ঘটে। বাজেট পেশের মাধ্যমে কর আরোপসহ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির মূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার জনপ্রতিনিধিদেরই। তাই জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়।
এবারের বাজেট নিয়ে আলোচনা শুধু সংসদেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাজেট ঘিরে দীর্ঘদিনের গোপনীয়তার সংস্কৃতিও অনেকটাই বদলে গেছে। কোন খাতে কত বরাদ্দ থাকবে, কর প্রস্তাব কী হতে পারে—এসব তথ্য এখন আগেই আলোচনায় চলে আসছে। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা বাজেটের কাঠামো নিয়ে মত দিচ্ছেন। একই সঙ্গে অংশীজনদের সঙ্গে যথেষ্ট পরামর্শ হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
সরকারের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। তবে একই সঙ্গে দেশের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশও জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা গেছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বলতা রয়েছে। আগের সরকারগুলোর সময়ও এই খাতে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেও জানা যায়। অর্থ ছাড়েও সতর্কতা ছিল, যার প্রভাব চলমান উন্নয়ন কর্মসূচিতে পড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়নের ধারা অব্যাহত ছিল। উন্নয়ন ব্যয় বাড়লে ঋণের চাপ আরও বৃদ্ধি পেত। এখন সুদসহ ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাজেটের সবচেয়ে বড় খাতগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
আগের প্রশাসনগুলোর সময় বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যাপক ব্যয়ের কারণে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। বর্তমান সরকার বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে। তবে নতুন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আগের তুলনায় বড় আকারে নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন ও অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
নতুন বাজেটের আকার প্রায় নয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণের বর্তমান অবস্থা খুব বেশি শক্তিশালী নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ উন্নয়ন সহযোগীদের শর্ত পূরণের বিষয়টিও বাজেট পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে।
এ অবস্থায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অতিরিক্ত উচ্চ হলে বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা সংশোধনের প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে। এতে ঘাটতি অর্থায়নের চাপ আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির ধারা এখনো অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন বাজেটে পূর্ববর্তী সরকারের নির্ধারিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনও রয়েছে, কারণ নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। দাম বৃদ্ধির পরও ভর্তুকির চাপ কমানো সহজ হচ্ছে না। চুক্তি পুনর্বিন্যাস বা সংস্কার আনার কথা বলা হলেও তা দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, কারণ এতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জটিলতা রয়েছে।
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে দেশীয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়তে পারে। বৈদেশিক সহায়তা প্রত্যাশিত মাত্রায় না এলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের গতি কমে যাওয়াও একটি বড় উদ্বেগ। ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন বাজেটে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণের কথা শোনা যাচ্ছে, তবে তা অর্জন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া অর্থনৈতিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও চাপের মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমাচ্ছে।
সুদের হার কমিয়ে ঋণ সহজলভ্য করার সুযোগ সীমিত। কারণ মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়ার প্রবণতায় রয়েছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ থেকেও বাজেট নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব বা পর্যালোচনা এসেছে। এতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হচ্ছে। বাজেট ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সামনে রেখে অর্থনীতি ঋণ, ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ সংকটের চাপের মধ্যে রয়েছে। উন্নয়ন ও রাজস্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

