আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি ব্যয়ের কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান দুটি উৎস—রপ্তানি ও প্রবাসী আয়—বাড়াতে প্রণোদনা বৃদ্ধির উদ্যোগও রাখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ প্রায় ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রাখা হতে পারে। অথচ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৯৫ হাজার ৩১ কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী বাজেটে ভর্তুকি ব্যয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা কমানো হচ্ছে।
ভর্তুকি ব্যয়ের চিত্র আরও স্পষ্ট হয় গত অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে সরকারের মোট ব্যয় ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। সেই তুলনায় নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য বরাদ্দ প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা কম।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, সারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে—এমন প্রত্যাশার ভিত্তিতেই ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা কমে এলে জ্বালানি ও সারের আন্তর্জাতিক মূল্য আরও সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে।
সরকারের আরেকটি পরিকল্পনা হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে সমন্বয় করা। এর মাধ্যমে ভর্তুকি বাবদ সরকারের আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হবে।
নীতিগতভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও খাদ্য খাতে সরকারের যে সহায়তা দেওয়া হয়, সেগুলো সাধারণত ভর্তুকি হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে কৃষি খাতে দেওয়া কিছু সহায়তা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দেখানো হয়। একইভাবে খাদ্য সহায়তার কিছু অংশ ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা—উভয় খাতেই অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে ভর্তুকি ব্যয়ের হিসাব নির্ধারণে কিছু জটিলতা থেকে যায় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
একদিকে ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও অন্যদিকে বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে রপ্তানি প্রণোদনা, পাট খাতের সহায়তা এবং প্রবাসী আয় উৎসাহিত করার জন্য দেওয়া প্রণোদনা মিলিয়ে মোট ১৬ হাজার ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১৫ হাজার ২২৫ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ভর্তুকি ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতগুলোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কৌশল বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তাদের মতে, এই নীতির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, জ্বালানি দামের ওঠানামা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর। কারণ একদিকে ব্যয় কমানো, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই আগামী বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

