নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের সময় যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, জনগণ এখন তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায় রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নথিতে। ফলে এবারের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং সরকারের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মধ্যে রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়েছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রত্যাশার তুলনায় কম রয়েছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন খাতেও স্থবিরতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শক্তিশালী করাই বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা খাত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এসব খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেকটাই পূরণ হতে পারে। পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। উদ্যোক্তাদের জন্য কর-সুবিধা বৃদ্ধি, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, প্রশাসনিক হয়রানি হ্রাস, একক সেবা ব্যবস্থা চালু এবং আধুনিক সরবরাহ ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে। প্রাপ্ত ইঙ্গিত অনুযায়ী, সরকার বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা ও সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
তবে বাজেটের সাফল্য কেবল ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না; এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উন্নয়ন ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে রাজস্ব সংগ্রহও সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর-সুবিধা দেওয়া হলে রাজস্ব আয়ের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। যারা নিয়মিত কর পরিশোধ করছেন, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব আদায়ের দক্ষতা বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
কারণ সরকারের ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও যদি আয়ের প্রবৃদ্ধি একই হারে না ঘটে, তাহলে ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে দেশি ও বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ পরিচালন ব্যয়ের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হয়েছে। ফলে রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

