স্থবির হয়ে পড়া বিনিয়োগে গতি ফেরাতে নতুন কর কৌশল নিচ্ছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে উৎসে কর হ্রাস এবং করপোরেট করহার আগামী পাঁচ বছর স্থিতিশীল রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিলাসী ও আমদানিনির্ভর পণ্যে শুল্ক ও কর বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে উৎসাহিত করতে করহার স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অডিট নির্বাচন ও উৎসে কর যাচাই প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর সুবিধা বহাল থাকবে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়লে করহার হবে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। সব লেনদেন ব্যাংকিং মাধ্যমে সম্পন্ন হলে এই হার কমে ২০ শতাংশে নামবে। অন্যদিকে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থাকলেও সব লেনদেন ব্যাংকিং মাধ্যমে করলে তা কমে ২৫ শতাংশে আসবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি ছিল উৎসে কর্তিত করকে ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য করার বিধান বাতিল করা। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে থাকলেও উৎসে কাটা কর ফেরত পেতে জটিলতায় পড়ে। নতুন বাজেটে আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎসে কর্তিত করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত পরিশোধিত কর ফেরত পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
রপ্তানি আয়ের নগদ প্রণোদনার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ে উৎসে কর ৬ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ এবং জ্বালানি তেল সরবরাহে উৎসে কর ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, উৎসে কর কমানো দীর্ঘদিনের দাবি। বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোক্তাদের জটিলতা কমানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে চাল, ধান, গম, ভোজ্যতেল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি সহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে অগ্রিম কর প্রত্যাহার এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহৃত কয়েকটি পণ্যে কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় তেলবীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছরের কর অবকাশ দেওয়ার চিন্তাও করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এর লক্ষ্য দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো। অন্যদিকে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় কিছু পণ্যে কর বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মধ্যে সিগারেট ও নিকোটিনজাত পণ্য, আমদানি করা কাজুবাদাম, বিদেশি মাছ, প্রসাধনী, মদ এবং বিলাসী খাদ্যপণ্য রয়েছে।
উচ্চস্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের দাম ১৮৫ টাকা থেকে ২১০ টাকা করার প্রস্তাব আছে। পাশাপাশি সিগারেটের কাঁচামাল ও নিকোটিনের ওপর অতিরিক্ত সম্পূরক শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। আমদানি করা কাজুবাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। বিদেশি মাছ, প্রসাধনী এবং নির্মাণ খাতের অন্যতম উপকরণ এমএস রডের ওপরও অতিরিক্ত কর আরোপের চিন্তা চলছে। এতে আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

