নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও যানজট নিরসনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প—এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট)—এর নির্মাণ ও সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এই দুই প্রকল্পে মোট ১১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুমোদন পেলে চলতি অর্থবছরের তুলনায় এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের বরাদ্দ প্রায় নয় গুণ বাড়বে। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটির সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৮০১ কোটি টাকা। অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের বরাদ্দ ৮৬৩ কোটি টাকা থেকে প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকায় উন্নীত হচ্ছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্র জানায়, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল হিসেবে এমআরটি লাইন-১ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার হয়ে পূর্বাচল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করবে। এতে ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিম অংশের যাতায়াত সহজ হবে। দুই প্রকল্পেই ডিপো উন্নয়ন, জমি অধিগ্রহণ এবং প্রাথমিক নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।
ডিএমটিসিএল সূত্র আরও জানায়, এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের পিতলগঞ্জ ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বিমানবন্দর অংশে ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এখন পর্যন্ত এতে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।
অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের ডিজাইন ও জরিপ কাজ শেষ হয়েছে। হেমায়েতপুর ডিপোর জমি অধিগ্রহণও সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজের অগ্রগতি ৮২ শতাংশের বেশি। প্রকল্পটির ১০টি প্যাকেজের মধ্যে কয়েকটির দরপত্র মূল্যায়ন ও ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তবে প্রকল্প দুটির ব্যয় নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা হলেও সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব অনুযায়ী এটি প্রায় ৯৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ডিএমটিসিএল। একইভাবে এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকার ব্যয়ও প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিএমটিসিএল কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, দরপ্রস্তাব বিশ্লেষণে দুই প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা মূল প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক বেশি।
এদিকে এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্প পরিচালক আব্দুল মতিন চৌধুরী জানান, বর্তমান সময়ে প্রকল্পের কাজের গতি বেড়েছে। তার ভাষায়, আগে সিদ্ধান্ত পেতে দেরি হওয়ায় অগ্রগতি ধীর ছিল, তবে এখন নির্দেশনা পাওয়ায় কাজ এগোচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের ১০টি প্যাকেজের মধ্যে একটি প্যাকেজ—ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজ—প্রায় ৮২ থেকে ৮৩ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি নয়টি প্যাকেজের মধ্যে কয়েকটির দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এখনো তিনটি প্যাকেজের কাজ বাকি রয়েছে, যেগুলোর প্রক্রিয়া চলমান।
অন্যদিকে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, উন্নয়ন অংশীদারদের শর্তের কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কঠিন হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানের চর্চা অনুসরণ না করলে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপও বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আয় সম্ভাবনা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি।

