প্রতিবছরই দেশের বাজেটের আকার বাড়ছে কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থবছরেই শতভাগ বাজেট বাস্তবায়নের নজির নেই। কাগজে বড় অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করা তুলনামূলক সহজ হলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারকে প্রতিবারই কাঠামোগত, আর্থিক ও প্রশাসনিক নানা বাধার মুখে পড়তে হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, বাজেটের আকার ধারাবাহিকভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়লেও বাস্তবায়নের হার উল্টো পথে যাচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার নেমে আসে ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে, যা ১৯৭৬–৭৭ সালের পর সর্বনিম্ন। আবার ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এ হার দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশে। এই ধারাবাহিক ঘাটতি বাজেট ব্যবস্থাপনায় গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবাস্তব ও অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য, কর-জিডিপি অনুপাতের দীর্ঘদিনের নিম্ন অবস্থান, ক্রমবর্ধমান ঋণ ও সুদের চাপ, নীতি প্রণয়নে অতি-কেন্দ্রীকরণ, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা—সব মিলিয়ে এবারের বাজেট বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশে একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে—বাস্তবায়নের সক্ষমতা সীমিত হলেও বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করা হয়। শোনা যাচ্ছে, এবারের বাজেট প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার হতে পারে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি কার্যকর বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাজেট প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট ধারা তৈরি হয়েছে। প্রথমে বড় বাজেট ঘোষণা হয়, পরে সংশোধনে তা কমে আসে এবং অর্থবছর শেষে বাস্তবায়ন আরও কমে যায়। তাই প্রশ্ন থেকে যায়—বড় বাজেট উন্নয়ন নিশ্চিত করে, নাকি বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোই বেশি জরুরি।
রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা বড় বাধা:
বাজেট বাস্তবায়নের সমস্যা শুরু হয় মূলত পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকেই। দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কর কাঠামো এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাস্তব সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে প্রায়ই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৯ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্য ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাকি দুই মাসে লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ১২৮ দশমিক ৬ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি দরকার, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নিম্ন অবস্থানে রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর ব্যবস্থার জটিলতা, কর ফাঁকি, সীমিত করজাল এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায় না। ফলে সরকারকে ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়।
ড. জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, রাজস্ব ঘাটতি হলে পুরো বাজেট কাঠামো চাপের মুখে পড়ে। কর বাড়াতে শুধু করজাল সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়, বরং করনীতি ও প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, বড় কর ফাঁকিবাজদের না ধরে ছোট করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে, যা কার্যকর সমাধান নয়।
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকায় বাজেট বাস্তবায়নে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। অবকাঠামো প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সরকারি ক্রয়ে ব্যয় বাড়লেও একই অর্থে কম কাজ হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে প্রকৃত অর্থমূল্য কমে যায়, ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সময়ও দীর্ঘ হয়। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যয় বাড়াতে হয়, যা উন্নয়ন খাতে অর্থ সংকট তৈরি করে।
রাজস্ব ঘাটতি হলে সরকারের সামনে সাধারণত দুটি পথ থাকে—ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া অথবা উন্নয়ন ব্যয় কমানো। বাস্তবে দুই পথই একসঙ্গে অনুসরণ করা হয়। এর ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ১৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমিয়ে ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৭৩ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দেশে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের বড় সমস্যা হলো প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীর গতি। বছরের শুরুতে ব্যয় কম থাকে, পরে শেষ সময়ে দ্রুত ব্যয় বাড়ানো হয়। এতে ব্যয়ের গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, দরপত্র প্রক্রিয়ার বিলম্ব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্বল সমন্বয় প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বড় বাজেট নয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাজেট বরাদ্দ দেওয়া সহজ, কিন্তু তা কার্যকরভাবে খরচ করাই আসল চ্যালেঞ্জ।
বড় উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট ও ঋণের কঠোর শর্ত বাজেট বাস্তবায়নে ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
কর সংস্কার, ভর্তুকি পুনর্গঠন এবং ব্যয় দক্ষতা বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে বিলম্বিত হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘাটতিও প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিবছর বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকে। কিন্তু বাস্তবায়ন দুর্বল হলে সাধারণ মানুষ তার পূর্ণ সুফল পান না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় বাজেট নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোই টেকসই উন্নয়নের মূল শর্ত।
অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেট বাস্তবায়ন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে। রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক ঋণের চাপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

