আগামী অর্থবছরের বাজেটে একদিকে যেমন বিভিন্ন খাতে করছাড় ও শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব থাকছে, অন্যদিকে করজাল সম্প্রসারণে কঠোর কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। সৃজনশীল অর্থনীতি বিকাশ, শিল্প-উদ্যোক্তা সহায়তা এবং ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে করনীতি ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য করছাড়ের মাধ্যমে নতুন খাতকে উৎসাহিত করা এবং একই সঙ্গে করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব ভিত্তি বিস্তৃত করা। তবে এতে সাধারণ করদাতা ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের লক্ষ্য বড় অর্থনৈতিক রূপান্তর। তিনি জানান, করছাড় ও ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণ জরুরি।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। ফলে নতুন হিসাব খুলতে আগে টিআইএন নিতে হবে। তবে শিক্ষার্থী, স্বল্পআয়ের নো ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট, ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব এবং পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে এ শর্ত শিথিল থাকতে পারে।
দেশে বর্তমানে ১৭ কোটির বেশি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে করজাল সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এছাড়া ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে প্রায় পৌনে চার লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। করপোরেট করহার অপরিবর্তিত থাকতে পারে। ব্যাংকে সঞ্চয়ের ওপর আবগারি শুল্কের সীমাও ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের সময় দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা কর কাটা হবে। পণ্য পরিবেশক বা সরবরাহকারীরা এই কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ৭০ লাখ খুচরা বিক্রেতা রয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে চাল, ডাল, তেল, চিনি, আলুসহ নিত্যপণ্যে করছাড়ের প্রস্তাব আসছে। বর্তমানে ৬০টি পণ্যে ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর থাকলেও তা কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশে নামানো হতে পারে। এই তালিকায় ধান, গম, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য রয়েছে।
দেশের সৃজনশীল খাতকে এগিয়ে নিতে চলচ্চিত্র, সংগীত ও ডিজিটাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব রয়েছে। গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বাদ্যযন্ত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহৃত ক্যামেরা ও যন্ত্রাংশে আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও প্রত্যাহার হতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় কমাতে হার্টের রিং, চোখের লেন্স এবং ডায়ালাইসিস চিকিৎসা সামগ্রীর ওপর কর ও ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। হার্টের রিংয়ের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহার হলে প্রতিটি রিংয়ের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা কমতে পারে। চোখের লেন্সেও দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও সংশ্লিষ্ট উপকরণে ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হলে প্রতিবার চিকিৎসা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫ ধরনের পণ্যে কর কমানো হতে পারে। মরচুয়ারি আমদানিতে শুল্কও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসের প্রস্তাব রয়েছে। দেশীয় ওষুধ শিল্পকে শক্তিশালী করতে ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধসহ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট তৈরির ৫১টি কাঁচামালে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে।
সোনার গয়নায় ভ্যাট কাঠামো পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট ভরিপ্রতি ২৫০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনাও আছে। বৈদ্যুতিক গাড়িতে শুল্ক-কর হার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে আনার প্রস্তাব করা হতে পারে। চার্জার ও চার্জিং স্টেশনে কর প্রত্যাহারেরও সম্ভাবনা রয়েছে। ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদন ও আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবায় আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানেও কর অব্যাহতি অব্যাহত থাকতে পারে। স্থানীয় স্টার্টআপ সেবায় ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং সেবা আমদানি ও অফিস ভাড়াতেও কর ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

