টাকা সৃষ্টি করলেই বাস্তব পণ্য ও সেবা সৃষ্টি হয় না। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি চাল, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বাড়িঘর, ওষুধ, ডলার বা কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। পণ্য ও সেবার সরবরাহ না বাড়লে নতুন সৃষ্ট ক্রয়ক্ষমতা একই পরিমাণ উৎপাদনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফল হলো মূল্যস্ফীতি
অর্থনীতি নিয়ে জনপরিসরের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত একটি বাক্য হলো ‘সরকার বাজেটের প্রয়োজন মেটাতে টাকা ছাপাচ্ছে।’ বাক্যটি শক্তিশালী, কিন্তু প্রায় ভুলভাবে বোঝা হয়। এর অর্থ সবসময় এই নয় যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিনরাত ছাপাখানা চালিয়ে কাগুজে নোট ছাপছে। আধুনিক অর্থনীতিতে টাকা সৃষ্টি হয় মূলত হিসাবনিকাশের মাধ্যমে: কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের হিসাবে টাকা জমা করে, অথবা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য সরবরাহ করে। ফলে সরকার কর থেকে আদায় করা অর্থ বা বাজার থেকে ধার নেয়া অর্থের চেয়ে বেশি ব্যয় করতে পারে।
আজকের বাংলাদেশে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এদেশ একসঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, বাড়তি সুদ পরিশোধ, দুর্বল রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাতের সংকট ও বৈদেশিক অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা; এর মধ্যে ১ লাখ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ।
এ আর্থিক হিসাবই ব্যাখ্যা করে কেন সরকারগুলো কখনো কখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। রাজস্ব ঘাটতি হলে এবং ঋণ নেয়া ব্যয়বহুল হয়ে গেলে টাকা সৃষ্টি সহজ সমাধান বলে মনে হয়। এতে বেতন দেয়া যায়, ভর্তুকি চালু রাখা যায়, ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা যায় এবং রাজনৈতিকভাবে কঠিন ব্যয়সংকোচন পিছিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু এ সহজ পথের একটি গোপন খরচ আছে।
প্রক্রিয়াটি মূলত সহজ। সরকার বাজেট ঘাটতিতে পড়ে। এরপর ট্রেজারি বিল বা সরকারি বন্ড ইস্যু করে। বাণিজ্যিক ব্যাংক বা সাধারণ মানুষ যদি নিজেদের সঞ্চয় দিয়ে এসব বন্ড কেনে, তাহলে সেটি স্বাভাবিক ঋণগ্রহণ। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সরাসরি এসব সরকারি সিকিউরিটিজ কেনে, অথবা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এমনভাবে তারল্য সহায়তা দেয়, যাতে তারা আরো বেশি সরকারি ঋণ ধারণ করতে পারে, তখন অর্থনীতিতে নতুন টাকা ঢোকে। সরকার সে টাকা ব্যয় করে এবং সে ব্যয় পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরবরাহকারীদের আয়ে পরিণত হয়। ব্যাংক আমানত বাড়ে। তারল্য বাড়ে। অর্থ সরবরাহ সম্প্রসারণ হয়।
প্রথম দিকে এ ব্যবস্থা কাজ করছে বলেই মনে হতে পারে। সরকার তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ এড়াতে পারে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেয়া যায়। উন্নয়ন প্রকল্প চলতে থাকে। ব্যাংকগুলো নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সরকারি কাগজপত্র পায়। অর্থনীতিতে যদি অব্যবহৃত উৎপাদন সক্ষমতা থাকে, তবে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা চাঙ্গাভাবও দেখা যেতে পারে।
কিন্তু টাকা সৃষ্টি করলেই বাস্তব পণ্য ও সেবা সৃষ্টি হয় না। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি চাল, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বাড়িঘর, ওষুধ, ডলার বা কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। পণ্য ও সেবার সরবরাহ না বাড়লে নতুন সৃষ্ট ক্রয়ক্ষমতা একই পরিমাণ উৎপাদনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফল হলো মূল্যস্ফীতি।
এ কারণে অতিরিক্ত মুদ্রানির্ভর ঘাটতি অর্থায়নকে প্রায় ‘মূল্যস্ফীতি কর’ বলা হয়। সরকার নাগরিকদের কাছ থেকে সরাসরি কর না নিলেও তাদের টাকার মূল্য কমে যায়। একজন শ্রমিকের বেতন নামমাত্র বাড়তে পারে; কিন্তু খাদ্য, বাড়িভাড়া, পরিবহন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি যদি আরো দ্রুত বাড়ে, তাহলে তার প্রকৃত আয় কমে যায়। সঞ্চয়কারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। পেনশনভোগীরা কষ্টে পড়েন। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাদের সম্পদের বড় অংশ নগদ টাকা বা সাধারণ আমানতে থাকে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে সংবেদনশীল মূল্যস্ফীতির পরিবেশে রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ শতাংশ ৭১, যা এপ্রিলে বেড়ে ৯ দশিমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়; চাপ আসছে বিশেষত খাদ্য, পরিষেবা ও পরিবহন খাত থেকে। এমন অবস্থায় টাকা সৃষ্টি করে বাজেট ঘাটতি অর্থায়ন করলে মূল্যস্থিতি ফিরিয়ে আনা আরো কঠিন হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রেখেছে এবং মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে তার অবস্থানকে সংকোচনমূলক হিসেবে বর্ণনা করেছে। যদি রাজস্বনীতি অর্থনীতিতে তারল্য ঢালে আর মুদ্রানীতি সে তারল্য সংযত করতে চায়, তাহলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুই হাত বিপরীত দিকে কাজ করতে শুরু করে।
দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো বিনিময় হারের ওপর চাপ। বাংলাদেশ জ্বালানি, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্প কাঁচামাল, ভোজ্যতেল, সার এবং বহু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য আমদানিনির্ভর। নতুন টাকা অর্থনীতিতে ঢুকলে তার একটি অংশ আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ায়। রফতানি আয়, প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ যথেষ্ট শক্তিশালী না হলে টাকার ওপর চাপ তৈরি হয়। টাকার অবমূল্যায়ন আবার আমদানি পণ্যের দেশীয় দাম বাড়ায়, যা নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঢেউ সৃষ্টি করে।
এটি শুধু তাত্ত্বিক উদ্বেগ নয়। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যা মার্চে কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। অথচ ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ ছিল প্রায় ৪৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একই সময়ে বৈদেশিক ঝুঁকিও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, উচ্চ জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও সম্ভাব্য প্রবাসী আয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় ফিচ বাংলাদেশের আউটলুক নেতিবাচক করেছে; দেশের প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
এ বাস্তবতা দেখায় অযত্নপূর্ণ মুদ্রানির্ভর ঘাটতি অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশের সুযোগ সীমিত। টাকা সৃষ্টি যদি মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন উসকে দেয়, তাহলে দেশ একটি দুষ্টচক্রে পড়তে পারে: উচ্চমূল্য সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজন বাড়ায়; বাড়তি ব্যয় বাজেট ঘাটতি বাড়ায়; ঘাটতি আরো ঋণ বা টাকা সৃষ্টির চাপ তৈরি করে; সে ঋণ বা টাকা সৃষ্টি মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ায়। একবার প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ব্যবসায়ীরা আগেভাগে দাম বাড়ায়, শ্রমিকরা মজুরি সমন্বয় দাবি করে, আমদানিকারকরা ডলার ধরে রাখে এবং পরিবারগুলো সঞ্চয় সরিয়ে স্বর্ণ, জমি বা বৈদেশিক মুদ্রায় রাখে। তখন আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সব ধরনের টাকা সৃষ্টি খারাপ, এমন ধারণাও সঠিক নয়। আধুনিক অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতই তারল্য সৃষ্টি করে। আর্থিক সংকট, মহামারী, যুদ্ধ বা ব্যাংকিং আতঙ্কের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাময়িক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থনীতিতে অব্যবহৃত সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতি কম থাকলে সীমিত মুদ্রা সহায়তা উৎপাদন স্থিতিশীল করতে সাহায্য করতে পারে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সাময়িক সহায়তা কর সংস্কার, ব্যয় শৃঙ্খলা, ব্যাংকিং সংস্কার ও বিশ্বাসযোগ্য ঋণ ব্যবস্থাপনার স্থায়ী বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের জন্য নীতি-শিক্ষা স্পষ্ট। বাজেটের নিয়মিত অর্থায়নের যন্ত্র হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে হবে প্রধানত উন্নত রাজস্ব সংগ্রহ, যুক্তিসংগত ব্যয়, উন্নত প্রকল্প বাছাই এবং স্বচ্ছ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে। কর অব্যাহতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা দরকার। অপচয়মূলক ভর্তুকি ও নিম্ন অগ্রাধিকারের উন্নয়ন প্রকল্প যাচাই করা দরকার। সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরো বাজারভিত্তিক ও পূর্বানুমানযোগ্য করতে হবে। ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সরকারি ঋণ উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগকে সরিয়ে না দেয়।
সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা। কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বাজেট ঘাটতি মুদ্রায়ন করতে বাধ্য হয়, তাহলে সে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মুদ্রানীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষ বিশ্বাস করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার মূল্য রক্ষা করবে। তাই রাজস্ব কর্তৃপক্ষের উচিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করা, কিন্তু তাকে অধীনস্থ করা নয়।
জনপরিসরের আলোচনাও আরো নির্ভুল হওয়া দরকার। অর্থের পরিমাণ বাড়লেই তা দায়িত্বহীন টাকা ছাপানো নয়। আবার সব সরকারি ঋণগ্রহণও বিপজ্জনক নয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক চাপের মধ্যে থাকা অর্থনীতিতে যদি বাজেট ঘাটতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক-সৃষ্ট তারল্য দিয়ে অর্থায়ন করা হয়, তাহলে ঝুঁকি বাস্তব।
টাকা ছাপানো সরকারকে আজকের বিল পরিশোধে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এটি বাস্তব উৎপাদন, শক্তিশালী রাজস্বভিত্তি, ব্যয় শৃঙ্খলা ও জনআস্থা বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন শুধু ঘাটতি কীভাবে অর্থায়ন করা হবে তা নয়; বরং কীভাবে তা করা হবে, যাতে দরিদ্র মানুষকে মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে কর দিতে না হয় এবং টাকা আরো দুর্বল না হয়। সহজ টাকার পথ সময় কিনতে পারে, কিন্তু স্থিতিশীলতা আনতে পারে কেবল সংস্কার।
- এম কবির হাসান: নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার; এএওআইএফআইয়ের নৈতিকতা ও গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য

