সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত এই বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আগামী অর্থবছরের জন্য মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলার লক্ষ্যেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিত এই কাঠামো বাস্তবায়ন হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। পাশাপাশি অর্থনীতিকে আরও গণমুখী করার মাধ্যমে জনমিতিক সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে। তাঁর প্রত্যাশা, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হবে।
বাজেটের ১০টি অগ্রাধিকার:
১. সবার জন্য উন্নয়ন:
সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা।
২. মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা:
দক্ষতা ও মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৩. সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা:
সব বয়স ও শ্রেণির মানুষের জন্য জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ।
৪. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থাননির্ভর অর্থনীতি;
শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কৃষিকে খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
৫. ব্যবসা সহজীকরণ ও নিয়ন্ত্রণ সংস্কার:
প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি।
৬. আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা:
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং পুঁজিবাজার সংস্কার।
৭. জ্বালানি নিরাপত্তা:
নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো।
৮. প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন:
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলে দেশকে রপ্তানিমুখী প্রযুক্তি উৎপাদনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
৯. পরিবেশ ও জলসম্পদ সুরক্ষা:
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নদী-খাল পুনরুদ্ধার এবং সবুজায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ।
১০. দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন:
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়নে দক্ষতা নিশ্চিত করা।
বাজেটের প্রধান পরিসংখ্যান:
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জাতীয় উৎপাদনের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জাতীয় উৎপাদনের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিতভাবে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। সেই তুলনায় এবারের বাজেট প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা বেশি।
বাজেট ঘোষণার পর সাধারণত পণ্য ও সেবার দামে পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে। এবারের বাজেটেও কিছু খাতে কর ও শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে করছাড় ও ভর্তুকির সুবিধা রাখা হয়েছে। এর ফলে কোন পণ্যের দাম বাড়বে বা কমবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

