জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। ফলে নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৯৩ কোটি টাকা।
আজ বৃহস্পতিবার বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে এ বরাদ্দের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ তৈরি করেছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংকট শুরু হয়, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। এতে দেশের বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ভর্তুকির ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়।
তিনি আরও বলেন, আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমশক্তির প্রধান গন্তব্য হওয়ায় সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা থাকলে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ সমস্যার জন্য আগের সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়ার নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্তের কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব এখনো জনগণ বহন করছে।
এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে জানান তিনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও স্থিতিশীল ও মানসম্পন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স আগামী তিন বছরে ২৭০ কিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কিলোমিটার দুই মাত্রিক এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার তিন মাত্রিক সাইসমিক জরিপ পরিচালনা করবে।
এ সময়ের মধ্যে ৬৯টি নতুন কূপ খনন এবং ৩১টি পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার বা মেরামতের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান রিগ কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সমুদ্র এলাকায় তেল–গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে পিএসসি কাঠামো সংশোধন করে “বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড” ঘোষণা করা হয়েছে।
জ্বালানি আমদানিতে নির্ভরতা কমাতে বহুমুখীকরণ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি আরও একটি নতুন টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। দেশের ভেতরে ৬০১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ৫০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।
বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। এতে শিল্প ও সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম খরচে, নিরবচ্ছিন্ন এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সুবিধা পাবে।

