প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—আমাদের দেওয়া করের টাকা আসলে কোথায় ব্যয় হয়? রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নাগরিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত রাজস্ব কীভাবে বিভিন্ন খাতে বণ্টন করা হয়, তা নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করলে করের টাকার ব্যবহার সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
সরকার নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এই বিশাল ব্যয়ের বড় অংশই আসবে কর ও অন্যান্য রাজস্ব আয় থেকে। তাই একজন করদাতার দৃষ্টিকোণ থেকে যদি ১০০ টাকা করকে ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে সেই অর্থ কোথায় এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যয় হবে, তার একটি বাস্তব চিত্র উঠে আসে।
সবচেয়ে বেশি ব্যয় ঋণের সুদ পরিশোধে
করের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ২০ টাকা ৫০ পয়সা ব্যয় হবে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে। এটি বর্তমানে বাজেটের সবচেয়ে বড় ব্যয় খাত। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভর্তুকি ও প্রণোদনায় ১৭ টাকা
জ্বালানি, কৃষি, বিদ্যুৎ এবং বিভিন্ন উৎপাদন খাতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে থাকে। একই সঙ্গে কিছু খাতে বিশেষ প্রণোদনাও দেওয়া হয়। এসব খাতে ব্যয় হবে ১৭ টাকা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল খাতকে সচল রাখতে এই ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সহায়তা ও মঞ্জুরিতে ১৫ টাকা ৭০ পয়সা
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুদান ও মঞ্জুরির জন্য ব্যয় হবে ১৫ টাকা ৭০ পয়সা। সরকারের কল্যাণমূলক কার্যক্রমের একটি বড় অংশ এই খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বেতন-ভাতায় ১৪ টাকা ৪০ পয়সা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ব্যয় হবে ১৪ টাকা ৪০ পয়সা। প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অন্যান্য সরকারি সেবা সচল রাখতে এই ব্যয় অপরিহার্য।
পণ্য ও সেবা ক্রয়ে ৯ টাকা
সরকারি অফিস পরিচালনা, বিভিন্ন সেবা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ের জন্য ৯ টাকা ব্যয় হবে। এটি সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অপ্রত্যাশিত ও বিবিধ ব্যয়ে ৬ টাকা ৪০ পয়সা
জরুরি পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রয়োজন মোকাবিলার জন্য ৬ টাকা ৪০ পয়সা সংরক্ষিত থাকবে।
পেনশন ও অবসর সুবিধায় ৫ টাকা ৭০ পয়সা
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যয় হবে ৫ টাকা ৭০ পয়সা। সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই খাত গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগ ও সম্পদ সৃষ্টিতে ব্যয়
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, শেয়ার ও ইকুইটি খাতে ব্যয় হবে ৫ টাকা ৩০ পয়সা। এছাড়া রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংগ্রহ ও উন্নয়নে ব্যয় হবে ৩ টাকা ৪০ পয়সা।
অন্যান্য খাতে ২ টাকা ৬০ পয়সা
বিভিন্ন ছোট ও বিশেষায়িত খাতে ব্যয় হবে অবশিষ্ট ২ টাকা ৬০ পয়সা।
বাজেটের মূল লক্ষ্য কী?
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
করদাতার টাকার গুরুত্ব
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো কর রাজস্ব। সড়ক, সেতু, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে জনগণের করের অর্থ।
তবে বাজেট বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে—করের টাকার সবচেয়ে বড় অংশ উন্নয়ন নয়, বরং ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং ঋণনির্ভরতা কমানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, একজন নাগরিকের দেওয়া ১০০ টাকার কর শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যয় নয়, দেশের অর্থনীতি, জনসেবা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম সচল রাখার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। :::

