কর ফাইলে অতিরিক্ত স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার দেখিয়ে অঘোষিত সম্পদ বৈধ করার প্রবণতা বন্ধ করতে নতুন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত অর্থ আইন সংশোধনের আওতায় স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বিক্রির মাধ্যমে আয় দেখালে সেই আয়কে মূলধনি মুনাফা হিসেবে বিবেচনা করে ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু করদাতা বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি স্বর্ণের মজুত কর ফাইলে উল্লেখ করে আসছেন। পরে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্জিত অর্থকে স্বর্ণ বিক্রির আয় হিসেবে দেখিয়ে করের দায় কমানোর সুযোগ নেওয়া হয়। নতুন এই কর ব্যবস্থা মূলত সেই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই আনা হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক করদাতা তাদের কর নথিতে ৩০ থেকে ৪০ ভরি বা তারও বেশি স্বর্ণ দেখিয়ে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই সম্পদের মূল্য হিসেবে “মূল্য অজানা” উল্লেখ করা হয়। অথচ বাস্তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে এত পরিমাণ স্বর্ণ নাও থাকতে পারে। কারও কাছে কয়েক ভরি স্বর্ণ থাকলেও নথিতে তার চেয়ে অনেক বেশি দেখানোর নজির রয়েছে।
কর প্রশাসনের ধারণা, ভবিষ্যতে অজানা উৎসের অর্থ বা সম্পদকে কর ফাইলে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতেই অনেকেই এ ধরনের তথ্য যুক্ত করেন। পরবর্তীতে সেই অর্থকে স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বিক্রির আয় হিসেবে দেখানো হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, যারা কর নথিতে প্রকৃত মালিকানার তুলনায় বেশি স্বর্ণ দেখিয়ে পরে সেই স্বর্ণ বিক্রির আয়ের নামে অর্থ প্রদর্শন করেন, তাদের করের আওতায় আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত অর্থ আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি স্বর্ণ বিক্রি করে আয় দেখালে তা মূলধনি মুনাফা হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য থেকে অর্জনের সময়কার বাজারমূল্য বাদ দিয়ে যে মুনাফা নির্ধারিত হবে, তার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক ক্ষেত্রে কর ফাইলে দেখানো স্বর্ণ বাস্তবে থাকে না। অজানা উৎস থেকে আসা অর্থকে স্বর্ণ বিক্রির অর্থ হিসেবে দেখিয়ে কর ফাঁকির চেষ্টা করা হয়। নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে এমন আয়ের ওপরও ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স আরোপের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
শুধু স্বর্ণ নয়, প্রস্তাবিত আইনে রৌপ্য, রত্ন, হীরা, মূল্যবান ধাতু, ধাতব মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা, চিত্রকর্ম, প্রাচীন শিল্পবস্তু এবং বিভিন্ন ক্লাবের সদস্যপদও মূলধনি মুনাফা করের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
কীভাবে নির্ধারণ হবে গেইন ট্যাক্স?
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, কোনো করদাতা যে বছরে স্বর্ণ অর্জনের তথ্য কর ফাইলে দেখিয়েছেন, সেই সময়ের বাজারমূল্য হিসাবের ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। আর যে বছরে স্বর্ণ বিক্রির আয় দেখানো হবে, সেই সময়ের বাজারমূল্যও বিবেচনায় নেওয়া হবে। বর্তমান মূল্য থেকে অর্জনকালের মূল্য বাদ দিলে যে অর্থ অবশিষ্ট থাকবে, সেটিই মূলধনি মুনাফা হিসেবে গণ্য হবে। এরপর সেই মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সম্পদ কমপক্ষে পাঁচ বছর ধরে মালিকানায় থাকতে হবে। পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে রাখা সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে মূলধনি মুনাফা কর প্রযোজ্য হবে। এর কম সময় ধরে রাখা সম্পদ বিক্রি করলে সাধারণ আয়কর হারে কর দিতে হবে। বর্তমানে ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার ৩০ শতাংশ, যা ২০২৮-২৯ করবর্ষে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বের অনেক দেশেই মূলধনি মুনাফার ওপর প্রায় ১৫ শতাংশ হারে কর আদায় করা হয়। বাংলাদেশেও একই ধরনের হার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একটি উদাহরণ:
ধরা যাক, একজন করদাতা ২০১০ সালে তার কর ফাইলে ৩০ ভরি স্বর্ণের তথ্য দিয়েছেন। সে সময় প্রতি ভরি ভালো মানের স্বর্ণের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪২ হাজার টাকা।
বর্তমানে যদি তিনি স্বর্ণ বিক্রির আয় হিসেবে ২০ লাখ টাকা প্রদর্শন করেন, তাহলে কর বিভাগ সেই আয়ের বিপরীতে কত ভরি স্বর্ণ বিক্রি হয়েছে তা বিবেচনা করবে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি ভরি স্বর্ণের মূল্য প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার টাকা। সে হিসাবে ২০ লাখ টাকা আয় দেখাতে প্রায় ৯ ভরি স্বর্ণ বিক্রির তথ্য প্রয়োজন হবে।
এই ৯ ভরি স্বর্ণের বর্তমান মূল্য ২০ লাখ টাকা থেকে ২০১০ সালের অর্জনমূল্য ৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বাদ দিলে মূলধনি মুনাফা দাঁড়াবে ১৬ লাখ ২২ হাজার টাকা। ওই মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা কর পরিশোধ করতে হবে। কর প্রশাসনের আশা, নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে কর ফাইলে অতিরিক্ত স্বর্ণ দেখিয়ে অঘোষিত সম্পদ বৈধ করার সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে আসবে।

