সরকারের সুদ পরিশোধ খাতে ব্যয়ের প্রাক্কলন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় পরবর্তী অর্থবছরগুলোর জন্য যে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে, সেখানে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী দুই অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে যে প্রক্ষেপণ দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
জাতীয় সংসদে গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রীর উপস্থাপিত বাজেট দলিলে দেখা যায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সুদ পরিশোধ খাতে সরকারের প্রকৃত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অথচ ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য এই খাতে প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা আগের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় কম।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটেও একই অঙ্ক অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বছর শেষে এই ব্যয় অন্তত ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী অর্থবছরেও সুদ পরিশোধ ব্যয় কমার সম্ভাবনা খুবই কম। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। বাজেট প্রণয়নের আগেই বৈদেশিক সম্পদ বিভাগ এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল।
পরবর্তী অর্থবছরগুলোর জন্য যে প্রক্ষেপণ দেওয়া হয়েছে, তাতে ব্যয়ের বড় বৃদ্ধি ধরা হয়েছে। ২০২৭–২৮ অর্থবছরে সুদ পরিশোধ ব্যয় ১ লাখ ৪২ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং ২০২৮–২৯ অর্থবছরে তা বেড়ে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও স্থানান্তর ব্যয়ের মতো খাতগুলো সরকারের পরিচালন ব্যয়ে ক্রমাগত চাপ তৈরি করছে। এই চাপ আগামী কয়েক বছরেও অব্যাহত থাকতে পারে।
একাধিক কর্মকর্তার মতে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের সুদ পরিশোধ খাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা দিয়ে বাস্তব ব্যয় মেটানো কঠিন হতে পারে। তবে সামগ্রিক বাজেটের ভারসাম্য রক্ষার জন্য আপাতত এই অঙ্ক দেখানো হয়েছে। উন্নয়ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ পুরোপুরি ব্যয় না হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে সেখান থেকে অর্থ স্থানান্তর করে সুদ পরিশোধ খাতে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে অন্যান্য খাতের অব্যবহৃত অর্থ থেকেও সমন্বয় করা হতে পারে।
গত শুক্রবার বাজেট–পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ ধরনের অসামঞ্জস্য নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠলেও অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কোনো মন্তব্য করেননি।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, দেশের বর্তমান ঋণ পরিস্থিতি এবং সুদের ব্যয়ের ধারা বিবেচনায় এই খাতে ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ারই কথা। তাঁর মতে, নিকট ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধ ব্যয় কমার কোনো সুযোগ নেই। তাই বাজেট প্রণয়নে শুধু নতুন বরাদ্দ নয়, আগের বছরের প্রকৃত ব্যয় ও সংশোধিত বাজেটের বাস্তব চিত্র আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদ পরিশোধের মতো বাধ্যতামূলক ব্যয়ে বাস্তবসম্মত প্রাক্কলন না থাকলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাজেট প্রস্তাব ও চূড়ান্ত বরাদ্দে প্রায়ই বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা দেখা যায়। সুদ পরিশোধ খাতের প্রস্তাবিত বরাদ্দও বর্তমান ঋণ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, ঋণের চাপ বিবেচনায় এ ব্যয় কমার সুযোগ নেই; বরং তা আরও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর বাজেট সংশোধনের সময় উন্নয়ন ব্যয় কমানো হলেও সুদ ও ভর্তুকির মতো বাধ্যতামূলক খাতে ব্যয় সাধারণত বাড়ে। তাই বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আরও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার প্রয়োজন।

