প্রস্তাবিত আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে অর্থবিলের নানা দিক। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এবার ব্যাপক পরিসরে করের জাল বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। এতে বড় ব্যবসায়ীদের তুলনায় সাধারণ মানুষ ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থবিল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সম্পূরক শুল্কে পরিবর্তন এনে হাজারের বেশি পণ্যের দামে প্রভাব ফেলার মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদিও দেশীয় শিল্প বিকাশে কিছু উদ্যোগ রয়েছে, তবু করপোরেট করহার না বাড়িয়ে বড় ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধা বজায় রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে অর্থবিলে উপজেলা থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের ছোট দোকান পর্যন্ত ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক দুই শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে প্রতি এক হাজার টাকার লেনদেনে দুই টাকা করে অগ্রিম কর কেটে রাখার বিধান যুক্ত হচ্ছে।
এছাড়া রাজস্ব আদায় না করলে প্রচলিত আইনের কঠোরতা বহাল রাখার বিষয়টিও অর্থবিলে রয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা আগামী পাঁচ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও আগামী অর্থবছরে তা বাড়ছে মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা। মূল্যস্ফীতির বর্তমান চাপের তুলনায় এটি খুব বেশি স্বস্তি দেবে না বলে বিশ্লেষকদের মত।
অন্যদিকে কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার রোধে দৃশ্যমান নতুন উদ্যোগ না থাকায় সমালোচনাও রয়েছে। প্রতিবেশী ভারতের মতো বিদেশে রাজস্ব অফিস স্থাপন কিংবা বিদেশি আইন সংস্থা নিয়োগের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রস্তাব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে সন্তুষ্ট করতে রাজস্ব অব্যাহতির সুযোগ সীমিত করা হয়েছে বলেও অর্থবিল বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এর ফলে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও শুল্ক কিছু ক্ষেত্রে বাড়লেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমার পরিবর্তে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ই-টিআইএন ব্যবস্থায়ও নতুন কঠোরতা আনা হয়েছে। এতদিন আয় না থাকলে শুধু রিটার্ন দাখিলের মাধ্যমে ই-টিআইএন রাখা যেত। তবে নতুন প্রস্তাবে করযোগ্য আয় থাকুক বা না থাকুক, গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিতে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ গ্রহণ, পাসপোর্ট তৈরি, বিদেশ ভ্রমণ, জমি বা ফ্ল্যাট কেনা, গাড়ি ক্রয় কিংবা ব্যবসার লাইসেন্স নবায়নের মতো প্রায় সব ক্ষেত্রেই রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। একই শর্ত যুক্ত হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগসহ বড় অঙ্কের কেনাকাটার ক্ষেত্রেও। তিন লাখ টাকার বেশি স্বর্ণ, মুক্তা বা মূল্যবান গহনা কেনার ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। হিমায়িত মাছ, গুঁড়া দুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মাখনসহ বিভিন্ন ফল ও খাদ্যপণ্যে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। বিস্কুট, চকলেট ও ময়দাজাতীয় খাবারেও শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকায় বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যানবাহনের ক্ষেত্রে নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নে অগ্রিম আয়কর আদায়ের বিদ্যমান ব্যবস্থা আরও কঠোর রাখা হয়েছে। গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষমতা ও মডেলের ওপর ভিত্তি করে এই কর কাঠামো আগের মতোই উচ্চ পর্যায়ে রাখা হয়েছে। সাধারণ আয়ের মানুষরা বলছেন, খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বাড়ার মধ্যে করের চাপ তাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মত দিয়েছেন, বাজেট বক্তৃতায় যেসব বিষয় আনা হয়নি, সেগুলো অর্থবিলে যুক্ত করা হয়েছে, যা সমালোচনা এড়ানোর কৌশল হতে পারে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সৃজনশীল খাত থেকে দেশের বাইরে থেকে উল্লেখযোগ্য আয় আসে এবং ভারতে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।
অর্থবিলে আরও বলা হয়েছে, সৃজনশীল খাতের আওতায় কুটির শিল্প, নাটক, সিনেমা, স্টেডিয়ামে খেলা দেখা এবং রিসোর্টে ভ্রমণের মতো ক্ষেত্রেও কর কাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব বাড়ানোর এই পরিকল্পনা একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি করেছে।

