দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষিসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গভীর কাঠামোগত ও আর্থিক সংকটে রয়েছে।
অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের মোট রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ৮১ শতাংশই বর্তমানে মাঝারি থেকে অতি উচ্চ মাত্রার আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, বাপেক্স, তিতাস গ্যাস, যমুনা অয়েল, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন এবং বিমান বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ থেকে অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান মূল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে গোষ্ঠীগত স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে। এর ফলেই বছরের পর বছর ধরে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান এখন বড় আর্থিক ও কাঠামোগত ঝুঁকির উৎসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে লোকসানে রয়েছে। ফলে প্রতি বছরই জাতীয় বাজেট থেকে ভর্তুকি, অনুদান বা ঋণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সহায়তা দিতে হচ্ছে সরকারকে, যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
এ ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের নেওয়া ঋণের বিপরীতে সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি প্রদান করে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই দায় সরাসরি সরকারের ওপর এসে পড়ে, যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় ধরনের অদৃশ্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত এবং কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণ সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বাড়ছে এবং তারল্য সংকটও গভীর হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি এবং সুশাসনের ঘাটতি এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
বেসরকারি খাতের তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত এবং শ্রম উৎপাদনশীলতাও তুলনামূলকভাবে কম। একই সঙ্গে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তারা টিকে থাকতে পারছে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি কিংবা সারের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মূল্য অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম নির্ধারণ করা হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণ না হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে লোকসানি কাঠামোয় আটকে পড়ছে।
অন্যদিকে মেগা প্রকল্পনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলের কারণে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপকভাবে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ এবং রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়ায় এসব ঋণ ও তার সুদ পরিশোধের সক্ষমতাও এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অর্থ বিভাগের ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছর পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে সরকারের দেওয়া সার্বভৌম ঋণ গ্যারান্টি থেকে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য আকস্মিক দায়, লোকসানি প্রতিষ্ঠানের পুনর্ভরণের প্রয়োজনীয়তা থেকে উদ্ভূত পরোক্ষ দায় এবং সরকারি ইকুইটি বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়ার বিষয়গুলো আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
নীতিগত এই মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা সক্ষমতা, তারল্য পরিস্থিতি এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে ভিত্তি করে সাতটি আর্থিক সূচকের মাধ্যমে ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়েছে। ১ থেকে ৫ স্কোরের মানদণ্ডে এই ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় মোট ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫০টি মাঝারি ঝুঁকিতে, ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিতে এবং ১৯টি অতি উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে ১২২টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ দায়ই উচ্চ থেকে অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৪৯টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ওপর কেন্দ্রীভূত।
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, লোকসানি চিনিকল, পাটকল বা টেক্সটাইল মিল রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালনার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নেই। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে তাদের অধীন থাকা মূল্যবান জমি আরও লাভজনক খাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি সরবরাহ (ওয়াসা), জরুরি পরিবহন ব্যবস্থা (বিআরটিসি) এবং বাজার স্থিতিশীলতায় ব্যবহৃত প্রতিষ্ঠান (টিসিবি) পুরোপুরি বেসরকারিকরণ করা উচিত নয় বলেও তিনি মত দেন।
তার ভাষায়, উন্নত বিশ্বেও এসব জনগুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা সাধারণত রাষ্ট্রের হাতেই থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের লোকসান বা ঝুঁকির পেছনে বড় কোনো অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই। মূল সমস্যা হলো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।
ডেসকোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক এবং পুঁজিবাজারে শীর্ষ অবস্থানে ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পেশাদার ব্যবস্থাপনা সরিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বা রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিতে পড়ে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাত থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার নীতিগত ভুল এবং অতিরিক্ত জনবল নিয়োগও লোকসান বাড়িয়েছে।
তার মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের দুটি পথ রয়েছে। প্রথমত, বাণিজ্যিকভাবে অকার্যকর ও অপ্রয়োজনীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বিক্রি করা। দ্বিতীয়ত, কৌশলগত ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীন ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার অধীনে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা করা।
দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের চাপে থাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এখন অতি উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। অর্থ বিভাগের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৫ স্কোরের মধ্যে সংস্থাটির ঝুঁকি স্কোর দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮৩, যা প্রায় সর্বোচ্চ ঝুঁকির কাছাকাছি অবস্থান নির্দেশ করে।
মূলত বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করার নীতিগত কাঠামোর কারণেই বিপিডিবি দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতিতে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংস্থাটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে নিট লোকসান ছিল ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিপিডিবি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সংস্থাটি সরকারের কাছ থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি গ্রহণ করেছে। এর আগের অর্থবছরে এই ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। সংস্থাটির ব্যয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে। ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হলেও লোকসান কমানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, বিদ্যুৎ খাতের এ সংকট দীর্ঘদিনের। তিনি জানান, সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্যারিফ পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির জন্য পৃথক কমিটি কাজ করছে এবং বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও আলোচনা চলছে। তাঁর মতে, এটি একদিনে তৈরি হওয়া সমস্যা নয় এবং ধীরে ধীরে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড, ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কল—যার মধ্যে শ্যামপুর, জয়পুরহাট, রাজশাহী, নাটোর, কুষ্টিয়া, মোবারকগঞ্জ, পাবনা ও ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড উল্লেখযোগ্য—এছাড়া রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)।
বিদ্যুৎ খাতের উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় থাকা ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। প্রতিষ্ঠানটি বিপিডিবি থেকে বিদ্যুৎ কিনে ঢাকার একটি অংশ ও নারায়ণগঞ্জে সরবরাহ করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ ক্রয় ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের প্রভাবের কারণে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
ডিপিডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিট লোকসান ছিল ৬৪৩ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩০৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ১৩৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বিদ্যুতের দাম সমন্বয় না হলে রাজস্ব আয়, পরিচালন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত ক্ষতির চাপ মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে। যদিও ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করেছে।
উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে থাকা আরেক প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো)। ঢাকা শহরের একটি অংশে বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত এ প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহক সেবার মানোন্নয়ন, স্মার্ট মিটার স্থাপন, স্ক্যাডা ব্যবস্থা ও বিভিন্ন আধুনিক প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। তবে তাদের প্রধান আয় গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে আসায় ব্যয় ও আয়ের ভারসাম্য ক্রমেই চাপে পড়ছে। ডেসকোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই হারে খুচরা পর্যায়ে সমন্বয় না হওয়ায় আয় কমে গেছে এবং আর্থিক চাপ বেড়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় আরও রয়েছে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল), ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ পিএলসি, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো)। এসব প্রতিষ্ঠানও বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রমে আর্থিক চাপ ও ভারসাম্যহীনতার মুখে রয়েছে।
তবে ঝুঁকি শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি খাতের সাতটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) অন্যতম। দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদিত গ্যাসের মাধ্যমে রাজস্ব চাহিদা পূরণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সরকারের ৫০টি কূপ খনন কর্মসূচিতে বাপেক্স প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাজ করছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটি রিগ ক্রয়, গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ) এবং বিভিন্ন বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে তাদের আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
জ্বালানি খাতের ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় আরও রয়েছে যমুনা অয়েল পিএলসি, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) এবং জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড।
এদিকে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি অবকাঠামো উন্নয়ন, উড়োজাহাজ ক্রয়, সার্বভৌম গ্যারান্টি এবং বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংসহ নানা সুবিধা পেলেও দীর্ঘ ৫৪ বছরে একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক এয়ারলাইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে ব্যর্থ হয়েছে। ধারাবাহিক লোকসান, ঋণ এবং দায়-দেনা প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় নিয়ে গেছে।
বিমানের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংস্থাটির মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। এর বাইরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে বিমানের আরও প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা দায় রয়েছে। একই সময়ে বিমান বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে, যার মূল্য ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন খাতের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাস ও ট্রাক পরিচালনায় ৮৮ কোটি টাকা লোকসান করেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এখন ১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। পুরোনো যানবাহন, অতিরিক্ত জনবল এবং ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত লোকসানে রয়েছে।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সরকার প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ২০০৪, ২০১২ এবং সর্বশেষ ২০১৮-১৯ সালে বিদেশি ঋণে কিছু নতুন যান যুক্ত হলেও এরপর বহর আধুনিকায়ন হয়নি। তার মতে, নতুন যান না আসায় চাপ বেড়েছে, পাশাপাশি অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।
তিনি জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ছিল মাসে ৮ কোটি টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ১৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে বেতন আরও বাড়লে নতুন যান না এলে এই চাপ বহন করা কঠিন হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি দায় ১ হাজার ১৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর অবস্থাও দুর্বল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড ১৩৪ দশমিক ৯০ কোটি টাকা এবং চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড ৩৩ দশমিক ২০ কোটি টাকা লোকসান করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস সরবরাহের অনিয়ম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং চলতি মূলধনের ঘাটতি এসব লোকসানের প্রধান কারণ।
দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোও উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) অধীন ১৫টি চিনিকল ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৬৭৯ দশমিক ১৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে। ধারাবাহিকভাবে এসব কারখানায় সরকারের বড় অঙ্কের ভর্তুকি ও আর্থিক সহায়তা দিতে হচ্ছে।
উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির তালিকায় থাকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড, এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড, খুলনা ওয়াসা এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এসব প্রতিষ্ঠানও বিভিন্ন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক চাপে পরিচালন ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
এ অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক ও টেকসই করার জন্য প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেল পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়েছে অর্থ বিভাগ। মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত সম্পদের গুণগত মান এবং দায়-দেনার সঠিক হিসাব নির্ধারণে কঠোর পর্যালোচনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আইনি জটিলতা দূর করে ব্যবসাবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক নীতিমালার আওতায় এনে পূর্ণ জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে জনসাধারণের করের অর্থের অপচয় রোধ করা যায়।
মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মধ্যে বেশ কয়েকটি নির্ধারিত সময়ে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিরীক্ষিত হিসাব না রাখার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন ৩৯২টি কোম্পানি, সংস্থা, করপোরেশন ও কর্তৃপক্ষকে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে চিঠি দেয় ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। এর মধ্যে ২৮৪টি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এফআরসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, সঠিকভাবে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত না করার কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান তা জমা দিতে পারেনি।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশের প্রায় সব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসানি ও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তাঁর মতে, এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়; বরং ঐতিহাসিকভাবে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে সংকটে পড়েছে এবং সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, একটি টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে এই বিশাল আর্থিক বোঝা দীর্ঘদিন বহন করা সম্ভব নয়। তাই একটি সামগ্রিক নীতির আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কোন প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয়ভাবে রাখা যৌক্তিক এবং কোনগুলো নয়।
তার মতে, বিশ্বজুড়েই অনেক দেশে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ বা পুনর্গঠনের পথে গেছে। একই বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভজনকভাবে চলতে পারলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কেন দীর্ঘদিন লোকসানে থাকবে—এ প্রশ্নও তিনি তোলেন। তাঁর মতে, মূল সমস্যা ব্যবস্থাপনায়।
তিনি আরও বলেন, যে প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় খাতে থাকবে সেগুলোকে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত করে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। আর যেগুলো এই কাঠামোয় টেকসই নয়, প্রয়োজনে সেগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়াই বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।

