প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। এবার এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা গতবারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনায় উপজেলা হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও জনবল বৃদ্ধি, বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, এক লাখের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জরুরি রোগী পরিবহনে হেলিকপ্টার সেবা চালুর মতো একাধিক বড় উদ্যোগ রয়েছে। তবে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়:
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেট বৃদ্ধি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও জরুরি হলো বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে খরচ করা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে নতুন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, এবার বরাদ্দের একটি টাকাও ফেরত না যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের এক দশমিক শূন্য এক শতাংশ। তুলনায় গত ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ ছিল।
উপজেলা হাসপাতাল উন্নয়নে বড় পরিকল্পনা:
স্বাস্থ্য বাজেটের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো দেশের ৪৬২টি উপজেলা সদর হাসপাতালকে ধাপে ধাপে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা। দীর্ঘদিন ধরে এসব হাসপাতালে শয্যা ও জনবল সংকট থাকায় রোগীদের জেলা শহর কিংবা রাজধানীর দিকে যেতে হয়। শয্যা বৃদ্ধি হলে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু অবকাঠামো নয়, জনবল সংকট বড় চ্যালেঞ্জ:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ভবন বা শয্যা বৃদ্ধি করলেই স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে না। প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও সহায়ক কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত না হলে এসব হাসপাতাল কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
পাঁচটি শিশু হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ:
প্রস্তাবিত বাজেটে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় পাঁচটি শিশু হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আটটি ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ১৮টি এক হাজার শয্যার সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীকেন্দ্রিক বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে ক্যান্সার, শিশুস্বাস্থ্য ও জটিল রোগ চিকিৎসায় রাজধানীর ওপর নির্ভরতা বেশি।
এক লাখের বেশি জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা:
আগামী অর্থবছরে পাঁচ হাজার চিকিৎসক এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। জনবল সংকটে থাকা স্বাস্থ্য খাতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট নার্সিং ইনস্টিটিউট অ্যান্ড কলেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সাইক নার্সিং কলেজের চেয়ারম্যান আবু হাসনাত মো. ইয়াহিয়া বলেন, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে নিয়োগে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, শুধু চিকিৎসক, নার্স বা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নয়, অপটোমেট্রিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট এবং পুষ্টিবিদের জন্যও পর্যাপ্ত পদ সৃষ্টি করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে মূল সমস্যা বরাদ্দ নয়, বরং সেই বরাদ্দ ব্যয়ের সক্ষমতা। তিনি বলেন, সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ কমানো না হলে এবং বছরের শেষে পুরো অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হলে তবেই জনগণ বাজেট বৃদ্ধির সুফল পাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, অভিজ্ঞতা বলছে বরাদ্দ বাড়লেও প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়মতো না হলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
‘এক টাকাও ফেরত যাবে না’ প্রতিশ্রুতি:
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং তা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এটি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ের সব হাসপাতালে শয্যা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় পাঁচটি নতুন শিশু হাসপাতাল চালুর প্রস্তুতি চলছে। জরুরি রোগী পরিবহনে আধুনিক অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি হেলিকপ্টার সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

