দেড় দশকেরও বেশি সময় পর জাতীয় বাজেটে এবার সবচেয়ে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত এসেছে। বিষয়টি বাইরে থেকে সহজ মনে হলেও ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় এটি গভীরভাবে জটিল এবং সূক্ষ্ম। মূল বার্তাটি হলো, রাষ্ট্র যদি ব্যবসার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে ধীরে ধীরে সরে আসে, তবে বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধির গতি অনেক বেড়ে যেতে পারে।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার অষ্টম অধ্যায়ে এই বাস্তবতা স্বীকার করা হয়েছে। যদিও উদ্যোক্তাদের কাছে এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তারা বলে আসছেন, বাংলাদেশে ব্যবসা করা ব্যয়বহুল হওয়ার মূল কারণ বাজার নয়, বরং বিধিবিধান বাস্তবায়নের জটিল ও ভারী প্রশাসনিক কাঠামো।
একটি প্রতিষ্ঠানের জীবনচক্রের প্রায় প্রতিটি ধাপেই বাধার সম্মুখীন হতে হয়। ব্যবসা শুরু করতে গেলে অনুমোদন ও নিবন্ধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া পেরোতে হয়। চালু হওয়ার পর নিয়মিত পরিদর্শন, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং একাধিক দপ্তরে একই তথ্য বারবার জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তির পথও দীর্ঘ ও জটিল আইনি কাঠামোর মধ্যে আটকে যায়। অনেক সময় সময়ের গতিও যেন সেখানে ভিন্ন রকম হয়ে দাঁড়ায়।
ব্যবসা বন্ধ করাও সহজ নয়। কার্যক্রম থেমে গেলেও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে দীর্ঘ সময় লাগে। প্রতিটি ফরম, অনুমোদন এবং স্বাক্ষর যেন এক ধরনের অতিরিক্ত খরচ হিসেবে কাজ করে। নিয়ম মানা অনেক সময় উদ্যোক্তার জন্য অদৃশ্য বোঝার মতো হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতায় অষ্টম অধ্যায়ে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে। এখানে বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধা মূলধনের অভাব নয়, বরং জটিল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। তাই ব্যবসা শুরু, পরিচালনা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ব্যবসা বন্ধ করার প্রক্রিয়াকে সহজ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে। একীভূত সেবা ব্যবস্থা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতে পরিচিতি বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সময়ও কমে আসবে।
দ্বিতীয় ধাপে দৈনন্দিন কার্যক্রমের জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুল্ক বিলম্ব, পরিদর্শন এবং নানা ধরনের শর্ত ব্যবসার খরচ বাড়ায়। এগুলো একত্রে বড় বাধা তৈরি করে। তাই নিয়ম সহজ করা, কাগজবিহীন শুল্ক ব্যবস্থা, আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তৃতীয় ধাপে বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিন ধরে মামলা নিষ্পত্তির বিলম্ব ব্যবসার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা এবং সহজ আপিল প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ ধাপে ব্যবসা বন্ধ করার প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি এসেছে। এটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলেও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যর্থ ব্যবসা দ্রুত বন্ধ করা গেলে সম্পদ নতুন ও সম্ভাবনাময় খাতে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। কিন্তু জটিল দেউলিয়া ব্যবস্থার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন অকার্যকর অবস্থায় থাকে, যা ব্যাংক খাতেও চাপ তৈরি করে এবং খেলাপি ঋণ বাড়ায়।
তবে অষ্টম অধ্যায়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন। এসব সংস্কার কে বাস্তবায়ন করবে, কারা তদারকি করবে এবং ব্যর্থ হলে দায় কার হবে—এ বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা নেই।
দেশে সংস্কারের ঘোষণা নতুন নয়, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। প্রতিটি সরকারই সরলীকরণের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু বাস্তবে জটিল ব্যবস্থার স্বার্থে থাকা গোষ্ঠীগুলো বাধা তৈরি করে। এখানে আরেকটি বাস্তবতা হলো, প্রশাসনিক জটিলতা কমলে অনেক জায়গায় নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে কিছু পক্ষ স্বাভাবিকভাবেই সংস্কারের বিরোধিতা করে। তাই এটি কেবল প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও।
আরেকটি বড় ঘাটতি হলো, সংস্কার প্রস্তাব চিহ্নিত হওয়ার পর বাস্তব পদক্ষেপে অগ্রগতি না হওয়া। অতীতে বিভিন্ন কমিশন ও গবেষণা বহু সমস্যার সমাধান প্রস্তাব করেছে, কিন্তু সেগুলোর বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। সংস্কারের আসল জায়গা হলো মাঠ পর্যায়ের দপ্তরগুলো। মন্ত্রণালয়ের নীতির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থানীয় অফিস, ভূমি প্রশাসন এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থার আচরণ। উদ্যোক্তারা রাষ্ট্রকে বুঝে এই জায়গাগুলো থেকেই।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জবাবদিহির অভাব। দায়িত্ব নির্দিষ্ট না থাকায় অনেক সংস্কার কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তব পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেয়ে কাগজে অগ্রগতি দেখানো সহজ হয়ে যায়। অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু পরিমাপ ব্যবস্থা থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না। অনেক সময় সূচক পরিবর্তন করেও বাস্তব চিত্র আড়াল করা হয়। তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা কতটা বদলেছে তা দেখা।
অষ্টম অধ্যায়ের গুরুত্ব পুরো বাজেটের সংখ্যাগত দিকের ওপর নির্ভর করে না। এর গুরুত্ব হলো, এটি প্রবৃদ্ধির পথে সেই বাধাগুলোর দিকে নজর দিয়েছে যেগুলো অর্থ বরাদ্দ বা ভর্তুকি দিয়ে সমাধান করা যায় না। যদি এই সংস্কারের অর্ধেকও বাস্তবায়ন হয়, তবে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে যে সহজ রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছেন, এই অধ্যায় সেই দিকেই ইঙ্গিত করেছে।
শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি সত্যিই এই সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সাহস ও প্রশাসনিক সক্ষমতা দেখাতে পারবে, নাকি এটি আবারও কেবল নীতিগত ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

