প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার তুলনায় এটি ১৮ শতাংশ বেশি। তবে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যে প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে প্রয়োজন হবে তার চেয়েও অনেক বেশি। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
সিপিডির ধারণা, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে আরও ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা আদায় হলেও বছর শেষে মোট রাজস্ব আদায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি হওয়া কঠিন হবে। সেই হিসাবে আগামী অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য বর্তমান বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অতীতের রাজস্ব আদায়ের ধারা, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় লক্ষ্যটি চ্যালেঞ্জিং। অন্যদিকে সরকার বলছে, রাজস্ব আয় বাড়াতে তারা ছয়টি কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, করনীতি সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কভিত্তিক আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনা।
এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেটের ব্যয়ের আকার খুব বেশি বড় নয়। একইভাবে আয়ের লক্ষ্যও অস্বাভাবিক নয়। তবে মূল সমস্যা রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা। তার মতে, দেশে রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় বাস্তবে কঠিন হবে। যদি রাজস্ব সংগ্রহ কম হয়, তাহলে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে অথবা বাজেটের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা দেখা দেবে। তার ভাষায়, রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মনে করেন, অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সরকার তিনটি প্রধান পথে এগোচ্ছে। এগুলো হলো রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালন ব্যয় কমানো। তার মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়লে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে এবং করের হার না বাড়িয়েও রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব হবে। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হলে করপোরেট কর, মূল্য সংযোজন কর এবং শুল্ক আয়ও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি ও জালিয়াতির যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। যেসব প্রকল্পে অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না, সেখানে নতুন ঋণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে। এই খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনতে ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ এবং নগদহীন লেনদেন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্বচ্ছতাও বাড়বে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য নির্ধারণে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ফলে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতেও শেষ তিন মাসে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের প্রয়োজন ছিল।
সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্ব সংগ্রহে প্রায় ৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা অত্যন্ত কঠিন।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে তা ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ এই লক্ষ্যকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করছেন না।
রাজস্ব বাড়াতে সরকারের ছয় কৌশল:
কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর:
কর ফাঁকি, তথ্য গোপন এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা কমাতে কর ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করসংক্রান্ত কার্যক্রম স্থানান্তরের পাশাপাশি অনুমোদিত সফটওয়্যারে সংরক্ষিত হিসাবকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
করনীতি ও প্রশাসনের পৃথকীকরণ:
করনীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনের কাজ আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের বিশ্বাস, এতে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষতা বাড়বে।
করজাল সম্প্রসারণ:
বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক সেবায় এর ব্যবহার বাড়ানো হবে।
কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা:
আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত কার্যক্রমের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ, নথি যাচাই এবং তদন্ত কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে কর ফাঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরোক্ষ কর থেকে আয় বৃদ্ধি:
বিদেশি ডিজিটাল সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আমদানিকৃত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কোমল পানীয় ও তামাকজাত পণ্যের ওপর উচ্চ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে বা বাড়ানো হয়েছে।
‘থ্রি আর’ কৌশল:
সরকার অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকন্সট্রাকশনভিত্তিক এই কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির আশা করছে সরকার।

