লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে জাতীয় রাজস্ব নীতি কাঠামোয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চলার মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত উল্টো সংকেত দিচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, সরকার পুঁজিবাজারকে আরও প্রাণবন্ত করতে চায়। তবে প্রস্তাবিত কর কাঠামোর কিছু পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজার থেকে সরিয়ে নিরাপদ খাতে, যেমন সরকারি সিকিউরিটিজের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, করপোরেট বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ আয়ের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ সুবিধাজনক করহার বাতিল হতে পারে। এর পরিবর্তে তাদের নিজস্ব করপোরেট করহার অনুযায়ী কর দিতে হবে। ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই হার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ফলে লভ্যাংশ আয়ে করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বিপরীতে ১৫ শতাংশ কর রেয়াত পাওয়া যায়। বাজেটে তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া কর রেয়াত পাওয়ার যোগ্য সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শূন্য কুপন বন্ড থেকে অর্জিত আয় বা ছাড়কৃত দামে কেনা এবং মেয়াদ শেষে পুরো মূল্য ফেরত পাওয়া সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে বর্তমানে কর অব্যাহতি রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে এই সুবিধা বাতিলের কথা বলা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষক ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মতে, এসব কর পরিবর্তন এমন সময়ে এসেছে যখন সরকার পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে চাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
এক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, করপোরেট ও খুচরা উভয় বিনিয়োগকারীর জন্য প্রস্তাবিত পরিবর্তন পুঁজিবাজারের জন্য ক্ষতিকর। তার মতে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি বড় ধাক্কা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, লভ্যাংশ আয় এমন একটি মুনাফা যা আগেই কর দেওয়া আয় থেকে আসে। তাই এর ওপর অতিরিক্ত কর আরোপকে তিনি দ্বৈত কর চাপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সংগঠনের সভাপতি বলেন, অন্য খাতে বেশি মুনাফা থাকলে বিনিয়োগ সেখানেও সরে যেতে পারে। তবে দেশে এখনো পর্যাপ্ত বিকল্প বিনিয়োগ মাধ্যমের ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, পুঁজিবাজার সংস্কারের সময় কর সুবিধা অন্তত আরও কিছু বছর বহাল রাখা প্রয়োজন। তবে বাজেটের কিছু দিককে ইতিবাচক বলেও মনে করছে বাজার সংশ্লিষ্টরা।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং প্রাথমিক শেয়ার ইস্যু প্রক্রিয়া সময়সীমাবদ্ধ ও ডিজিটাল করা হবে। একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও তারল্য বাড়তে পারে এবং তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ হবে।
এছাড়া বাজার অবকাঠামো আধুনিকায়নে নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে দুই কার্যদিবস থেকে এক দিনে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কিছু প্রক্রিয়া সহজ করার কথাও বলা হয়েছে। তবে এতে বাজারে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এসব উদ্যোগ পুঁজিবাজার উন্নয়নে সহায়ক হবে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান এক বিবৃতিতে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়লে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে।

