ব্যবসা ও বিনিয়োগের দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ধীরগতির অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নানা নীতিগত বাধা দূর করতে বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। উদ্যোক্তাদের জন্য লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো সংস্থা সিদ্ধান্ত না দিলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করা, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠন এবং এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘রোডম্যাপ ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি ২০২৬’ শীর্ষক সম্মেলনে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরেন সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা। সেখানে অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং ব্যবসা সহজীকরণ নিয়ে ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
সম্মেলনে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ অপসারণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তাঁর মতে, দেশে ব্যবসা করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি তৈরি হয় অনুমোদন প্রক্রিয়ায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৯ থেকে ৪০টি অনুমোদন নিতে হয়, যা বিনিয়োগের গতি কমায় এবং খরচ বাড়ায়।
তিনি জানান, এ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সব সরকারি সংস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কাঠামোর আওতায় আনা হবে। কোনো বিনিয়োগ বা ব্যবসায়িক আবেদন জমা দেওয়ার পর সাত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না এলে সেটি স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন হিসেবে গণ্য হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু নিয়ন্ত্রণ শিথিল করাই যথেষ্ট নয়, দেশের আর্থিক কাঠামোও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পুনর্গঠন করতে হবে। বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় ঋণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বছরে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা শুধু সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোয় ব্যয় করা গেলে অর্থনীতি আরও উপকৃত হতো।
তিনি আরও জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের সক্ষমতার ভিত্তিতে অর্থায়ন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, বরং বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক রূপান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা এবং এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়, বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের কাজ ব্যবসা পরিচালনা নয়, বরং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। জ্বালানি সংকট, লজিস্টিক দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত বিধিনিষেধ এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, চলতি বাজেট সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বিনিয়োগবান্ধব বাজেট। বিভিন্ন বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। এমন একটি প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে একজন বিনিয়োগকারী মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে কারখানা নির্মাণ শুরু করতে পারবেন। বর্তমানে এ প্রক্রিয়ায় ১৮০ থেকে ৩৬৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে।
জ্বালানি খাত নিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা কৌশলগত অগ্রাধিকার। অব্যবহৃত সরকারি জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, ছাদভিত্তিক সৌর নীতিমালা সহজীকরণ এবং জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প শুরু এবং ইআরএল–২ প্রকল্পের পরিধি চূড়ান্ত করার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বৈশ্বিক মানের বন্দর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এক বছরের মধ্যে এ খাতে দৃশ্যমান উন্নয়ন আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের কাজ চলছে।
তিনি আরও জানান, লোকসানি ২০টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ বা সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্বের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনের প্রধান অতিথি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার একটি স্থিতিশীল, শিল্পোন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের প্রস্তুতিও রয়েছে। উন্নয়নের সুফল শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, কৃষক, শ্রমিক, প্রান্তিক উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এর অংশীদার হবেন।
তিনি বলেন, অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল অবস্থায় পাওয়া গেছে। এখন সেগুলো পুনর্গঠন করে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করে সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও চলছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সম্ভাবনার ওপর আস্থা রাখলে হতাশ হতে হবে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে ধীর প্রবৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু ঝুঁকি, বাণিজ্য বাধা এবং জ্বালানি সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের ব্যয়ও বেড়েছে।
তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য। বিদেশি ও দেশি অংশীদারদের আস্থা পুনরুদ্ধার এখন প্রধান অগ্রাধিকার। বাংলাদেশকে স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য এবং ব্যবসাবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। তিনি আরও জানান, বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোকে শুধু কূটনৈতিক কেন্দ্র নয়, বরং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের কেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন, পঞ্চম প্রজন্মের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট অব থিংস বৈশ্বিক বাণিজ্যের কাঠামো বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হতে পারবে।
দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিদেশি মিশন, বহুজাতিক কোম্পানি এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় উঠে আসে—ব্যবসা সহজীকরণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, জ্বালানি ও লজিস্টিক সংস্কার এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ঘটাতে চায় সরকার।

