গ্যাস সংযোগ না থাকায় জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প উৎপাদন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী তাদের কারখানার নির্মাণ প্রায় শেষ করলেও এখনো জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করতে পারেননি।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, এই অঞ্চলে প্রায় ১৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনের জন্য জমি বরাদ্দ পেয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রায় ২০ কোটি ডলার। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগ পেয়েছে। ফলে একাধিক কারখানা নির্মাণ শেষ করেও চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংযোগ পাওয়া গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবে।
বেজা সূত্র আরও জানায়, ২০২২ সালেই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিটি শিল্প প্লটে গ্যাস পাইপলাইন পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এরপর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিষয়টি নিয়ে বৈঠকও হয়েছিল এবং একটি প্রতিষ্ঠানকে সংযোগ দেওয়া হয়।
বর্তমানে নতুন সরকারের উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছে বেজা। সংস্থাটি মনে করছে, গ্যাস সংযোগ পাওয়া গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে অন্তত ১০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারবে।
এলপিজি ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের প্রস্তুতি:
গ্যাস না পেয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে সুইফট শিল্ড বাংলাদেশ লিমিটেড প্রায় ১.১৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ল্যাটেক্স এক্সামিনেশন গ্লাভস কারখানা স্থাপন করেছে। গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ শরীফ খান বলেন, প্লট বরাদ্দের এক বছরের বেশি সময় পার হলেও গ্যাস সংযোগ মেলেনি। প্রায় আট মাস আগে আবেদন করা হলেও এখনো অনুমোদন আসেনি। তিনি জানান, কারখানার অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। গ্যাস পেলে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। তবে বর্তমানে এলপিজি ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মিততা বড় সমস্যা। প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং থাকায় জেনারেটর ও ইউপিএস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই কারখানায় প্রায় ১০০ জনের কর্মসংস্থান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মিনমেটাল বিডি লিমিটেড প্রায় ২.৭৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে মেটাল ফিটিংস কারখানা স্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে বায়োলিপ ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, বায়োলিপ এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি, কিউ সেলসিয়াস জামালপুর লিমিটেড, এমএজেড টেক্সটাইলস লিমিটেড এবং বারিধারা প্যাকেজিং লিমিটেডসহ একাধিক প্রকল্প প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। রেসাসকেমি বাংলাদেশ লিমিটেডের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের নির্মাণ কাজ প্রায় ৯৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্টস ও ফাইন্যান্স বিভাগের প্রধান মতিয়ার রহমান বলেন, এখন শুধু ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে এবং যন্ত্রপাতিও এসে গেছে। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না থাকায় কারখানা চালু করা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, প্রকল্পে টেক্সটাইল খাতে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং শিল্প রাসায়নিক খাতে প্রায় ৭.৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। উৎপাদন শুরু হলে প্রায় এক হাজার জন টেক্সটাইল খাতে এবং দুই শতাধিক জন রাসায়নিক ইউনিটে কর্মসংস্থান পাবেন।
জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। সংস্থাটির জামালপুর শাখার ব্যবস্থাপক দুর্জয় খোকশি বলেন, গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের একক এখতিয়ার নয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরই তারা ব্যবস্থা নিতে পারেন। তিনি জানান, একটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে সংযোগ পেয়েছে। অন্যদের বিষয়ে প্রক্রিয়া চলমান এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে চাপ রয়েছে, তবে শিল্প খাতই তাদের অগ্রাধিকার। তিনি আরও বলেন, গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে এবং কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বেজার নির্বাহী সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা গ্যাস সংযোগের ঘাটতি। তার মতে, অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় বিনিয়োগ বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি জানান, গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে এই অঞ্চলে শিল্প কার্যক্রম দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে।
প্রায় এক দশক আগে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য নিয়ে জামালপুর সদর উপজেলার দিগপাই এলাকায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়। ৪০০ একরের বেশি জমিতে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলে পোশাক, কৃষিভিত্তিক শিল্প, চিকিৎসা সামগ্রী ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল।
গ্যাস সংকটের কারণে এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে শিল্প কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থানও আটকে আছে। ময়মনসিংহ বিভাগের প্রথম সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে এটি প্রায় ৩২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়।
অবকাঠামোর মধ্যে গ্যাস পাইপলাইন, সাবস্টেশন, প্রশাসনিক ভবন, ডরমিটরি ভবন, পানির জলাধার ও সীমানাপ্রাচীরসহ সব কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠান লিজ চুক্তি করেছে। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান শিগগির উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবায়ন আটকে রয়েছে।

