নির্বাচনের পর ঘোষিত প্রথম বাজেট সাধারণত একটি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়। আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটও সেই ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিদায়ী বাজেটের তুলনায় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা বেশি ব্যয়ের এই পরিকল্পনাকে অনেকেই উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর পরিসর যে বড়, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় নতুন বাজেটের আকার প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। দেশের বাজেট ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, কারণ সাধারণত বাজেট সম্প্রসারণ ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকে। ফলে ব্যয় বাড়ানোর সঙ্গে সমানভাবে আয় বাড়ানোর সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ৫ লাখ কোটি টাকাও অতিক্রম করা কঠিন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব অর্জনের ব্যবধান দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। অথচ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির প্রকৃত আদায় ছিল ৩ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। এই অবস্থায় রাজস্ব আয় প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধির প্রত্যাশাকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
শুধু রাজস্ব নয়, ব্যয়ের দিকেও চাপ বাড়ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃষক সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও অনেক ক্ষেত্রে সেবার মান প্রত্যাশিতভাবে উন্নত হয় না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নতুন বরাদ্দের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
একই সময়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ভর্তুকির চাপও সরকারকে বহন করতে হবে। কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ থাকায় ব্যয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ভর্তুকি ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়—উভয় দিক থেকেই অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি হবে।
এই ব্যয় মেটাতে সরকারকে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। তবে এখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমিক ২০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বনিম্ন। একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে যেখানে বেসরকারি খাত প্রধান চালিকাশক্তি, সেখানে এই ধীরগতি শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং দেশের ঋণমান হ্রাস বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু একই সময়ে যদি সরকার সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি গ্রহণ করে, তবে নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাজেটের সাফল্য কখনোই শুধু এর আকার দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের বাস্তবসম্মত ভারসাম্য, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাই এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের রাজনৈতিক প্রয়োজন থাকলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন টেকসই অর্থায়ন। রাজস্ব সংগ্রহে মৌলিক সংস্কার, ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বড় বাজেট প্রত্যাশিত সুফলের বদলে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
অতীতে দেখা গেছে, অনেক উন্নয়ন কর্মসূচি বরাদ্দের অভাবে নয়, বরং দুর্বল পরিকল্পনা, জটিল ক্রয় প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। তাই আগামী অর্থবছরে চ্যালেঞ্জ শুধু বাজেট প্রণয়ন নয়, বরং এর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও।
সবশেষে বলা যায়, নতুন সরকারের সামনে নতুন সমাধান ও নতুন প্রত্যাশা থাকবেই। তবে একই সঙ্গে ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা, দক্ষতা বাড়ানো এবং সমন্বিতভাবে কাজ করার চ্যালেঞ্জও সমানভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

