বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটকে এমন একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা রয়েছে। বাজেটের বিভিন্ন বরাদ্দ ও পদক্ষেপ পর্যালোচনা করলে মনে হয়, সরকারের লক্ষ্য ছিল বিস্তৃত পরিসরে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা এবং জনআস্থা অর্জন করা। সামগ্রিকভাবে বাজেটে সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা বিবেচনায় নেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট।
নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের দিকেও বাজেটে সচেতন উদ্যোগ দেখা যায়। তবে কাগজে-কলমে পরিকল্পনা থাকলেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে না পারলে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।
বাজেটে কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর কমিয়ে দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সিগারেট ও কয়েকটি বিলাসপণ্যে করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, শুল্ক কমানোর সুফল শেষ পর্যন্ত ভোক্তারা পাবেন কি না। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কর বা শুল্ক কমালেও সব ক্ষেত্রে বাজারমূল্যে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। এর অন্যতম কারণ দেশের বাজারব্যবস্থার বিদ্যমান দুর্বলতা। এই সমস্যাগুলো দূর না হলে কর ছাড়ের সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য নতুন অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তৈরি করা জরুরি, আর সেই শক্তির অন্যতম উৎস হতে পারে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণি।
ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ—সব ধরনের উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। তবে শুধু কর-সুবিধা বা সহজ ঋণ দিলেই উদ্যোক্তা তৈরি হয় না। উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থা। এর মধ্যে কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, বাজারসংযোগ, কর-সুবিধা এবং জ্বালানির সহজ প্রাপ্যতার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে এমন পূর্ণাঙ্গ উদ্যোক্তা সহায়তা প্যাকেজের উপস্থিতি স্পষ্ট নয়।
বর্তমান রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা বিবেচনায় আগামী অর্থবছরের উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ের রাজস্ব আদায়ের প্রবণতার সঙ্গে তুলনা করলে লক্ষ্যমাত্রা বেশ উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হয়। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশেরও কম, যেখানে সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোতে এই হার সাধারণত ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বড় ধরনের সংস্কার অপরিহার্য। সংস্কার ছাড়া শুধু আগামী বছর নয়, ভবিষ্যতের বছরগুলোতেও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
বর্তমান কর কাঠামোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজস্বের অধিকাংশই আসে পরোক্ষ কর থেকে, আর তুলনামূলক কম আসে প্রত্যক্ষ কর থেকে। দীর্ঘমেয়াদে এই ভারসাম্যহীন কাঠামো টেকসই নয়।
রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি হলে সরকারকে ব্যাংকঋণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর আরও নির্ভরশীল হতে হবে। এতে একদিকে বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়বে, অন্যদিকে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফল কর্মসংস্থানেও পড়বে। এই পরিস্থিতিতে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। পাশাপাশি সুকুক বন্ডের মতো বিকল্প অর্থায়ন উৎস ব্যবহারের বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে কর কাঠামো সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া সম্ভব হবে।
দেশের ব্যাংক খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। খাতটির দুর্বলতাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে যে সংস্কার প্রত্যাশিত ছিল, তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতির বদলে অবনতি ঘটেছে। ফলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতার উদাহরণ সামনে রয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে, এ ধরনের সমস্যা অন্য ব্যাংকেও প্রভাব ফেলতে পারে। সংশ্লিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু হলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা অব্যাহত রাখতে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাংক খাতের সংস্কার না হলে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সঠিকভাবে করা গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় সম্ভব। অতীতে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পসহ অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয় ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত হচ্ছে না এবং জনগণও প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছে না। এই বাস্তবতায় উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামগ্রিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি প্রাথমিক রূপরেখা রয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে পরিকল্পনার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
- মোস্তফা কে মুজেরী: সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক

