আগামী অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সরাসরি এমন সুযোগ থাকার কথা অস্বীকার করলেও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, ভিন্ন কাঠামোয় সেই সুযোগ বহাল রয়েছে। এর মধ্যেই অপ্রদর্শিত আয়ের নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে এনবিআর।
সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, বাজেটে যে সুযোগ রাখা হয়েছে তাকে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় বলা যাবে না। তাদের মতে, এটি মূলত মূলধনি আয় বা ‘ক্যাপিটাল গেইন’। তবে অর্থনীতিবিদরা এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। তাদের বক্তব্য, অপ্রদর্শিত আয় এবং মূলধনি আয় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বাজেটেও জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। যদিও বাজেট বক্তৃতায় বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবু সংশ্লিষ্ট বিধান পর্যালোচনায় এমন সুযোগ বিদ্যমান বলে তারা মনে করছেন।
বিশেষ করে জমি ও অ্যাপার্টমেন্টের লেনদেনে প্রকৃত বাজারমূল্য এবং নিবন্ধনের সময় ব্যবহৃত মৌজা মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ হিসাবের বাইরে থেকে যায়। এই ব্যবস্থাগত দুর্বলতার কারণেই অনেক অর্থ অপ্রদর্শিত অবস্থায় থেকে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এ কারণে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ বাজেটে না রাখার দাবি বিভিন্ন মহল থেকে আগেই জানানো হয়েছিল।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় কোনো করদাতা জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট বিক্রির সময় প্রকৃত মূল্য এবং নথিভুক্ত মূল্যের মধ্যকার যে অংশ রিটার্নে আগে দেখানো হয়নি, তা পরবর্তী সময়ে আয় হিসেবে ঘোষণা করতে পারবেন। নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করলে সেই অর্থ বৈধ আয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে এজন্য আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে যে অর্থটি সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে এবং তার সমর্থনে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণও থাকতে হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান এ ধরনের আয়কে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় হিসেবে অভিহিত করতে নারাজ। তার ভাষ্য, এটি মূলত মূলধনি সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত আয় বা ক্যাপিটাল গেইন।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি ১০ লাখ টাকায় জমি বিক্রি করেন, কিন্তু মৌজা মূল্য অনুযায়ী ২ লাখ টাকায় নিবন্ধন সম্পন্ন হয়, তাহলে অবশিষ্ট ৮ লাখ টাকা একই অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে দেখানোর সুযোগ থাকবে। রিটার্নে সেই অর্থ জমি বিক্রিজনিত আয় হিসেবে উল্লেখ করতে হবে এবং প্রযোজ্য কর পরিশোধের পর তা বৈধ হিসেবে গণ্য হবে। চলতি অর্থবছরেও একই সুযোগ রয়েছে।
তবে আর্থিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাপিটাল গেইন বলতে বোঝায় কোনো সম্পদ ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে অর্জিত মুনাফা। উদাহরণ হিসেবে, কেউ যদি ১০ লাখ টাকায় একটি সম্পদ কিনে ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করেন, তাহলে ২ লাখ টাকা হবে তার মূলধনি মুনাফা বা ক্যাপিটাল গেইন। এই মুনাফার ওপর আরোপিত করকে বলা হয় ক্যাপিটাল গেইন কর।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, জমি বিক্রির অপ্রদর্শিত আয়কে কোনোভাবেই ক্যাপিটাল গেইন বলা যায় না। তিনি বলেন, এনবিআর চেয়ারম্যানের বক্তব্য নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে তিনি বাজেটের প্রস্তাবিত বিধানকে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ হিসেবেই দেখছেন।
তার মতে, এ ধরনের সুযোগ বারবার দেওয়া হলেও সরকারের রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায় না। বরং এটি নিয়মিত কর পরিশোধকারী সৎ করদাতাদের জন্য নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, মৌজা মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণেই বিপুল পরিমাণ অর্থ হিসাবের বাইরে থেকে যায়। সরকার এখন মৌজা রেট হালনাগাদের কথা বলছে। নীতিমালায় পরিবর্তন আনার আগে বর্তমান ব্যবস্থার অধীনে এটিই হয়তো অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার শেষ সুযোগ হতে পারে।

