জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে, দেশে সরকারি উদ্যোগে নতুন কোনো পাটকল স্থাপনের পরিকল্পনা নেই। বরং পাটখাতে নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
গতকাল সোমবার (১৫ জুন) সংসদের অধিবেশনে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের লিখিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অধিবেশনটি বিকেল ৩টায় শুরু হয় এবং সভাপতিত্ব করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। মন্ত্রী বলেন, বন্ধ থাকা পাটকল চালু হলে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংসদে তিনি জানান, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের আওতাধীন ২৫টি মিলের মধ্যে বর্তমানে ৯টি মিল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু রয়েছে। সরকারের ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অবশিষ্ট মিলগুলোও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ডিসেম্বরের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল জানতে চান, পাটশিল্পের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে উৎপাদন বৃদ্ধি, বন্ধ মিল চালু এবং নতুন পাটকল স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না। জবাবে মন্ত্রী আরও জানান, পাট উৎপাদন বাড়াতে সরকার ‘উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি আগামী ৩০ জুন শেষ হবে। এরপর একই ধরনের কার্যক্রম রাজস্ব বাজেটের আওতায় চালু রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ১ জুলাই সরকারি সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের আওতাধীন ২৫টি মিলের উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে ২০টি মিল সরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা ভিত্তিতে পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৪টি মিলের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে এবং ৯টি মিল ইতোমধ্যে চালু হয়েছে।
অবশিষ্ট ৬টি মিল ইজারা প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি মিলের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে, ১টির ক্ষেত্রে আগ্রহপত্র মূল্যায়ন চলছে, ১টির জন্য আগ্রহপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং আরেকটি মিল প্রক্রিয়াধীন। ইজারা বহির্ভূত ৫টি মিলের মধ্যে ৩টি সিটি করপোরেশন এলাকার কারণে এবং ২টি মামলা জটিলতার কারণে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সরকার স্পষ্ট করেছে, নতুন কোনো পাটকল সরকারি উদ্যোগে স্থাপনের পরিকল্পনা নেই।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সরকারি পাটকলগুলো পর্যায়ক্রমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পাটশিল্পে গতি ফেরানোই মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি আধুনিক ও বহুমুখী পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উৎপাদন শুরু হলে শুধু ঐতিহ্যবাহী পণ্য নয়, বরং জুট ব্যাগ ও হোম টেক্সটাইলসহ আধুনিক পাটপণ্যের রপ্তানি বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার ঘটবে। পাটের স্থানীয় চাহিদা বাড়লে কাঁচা পাটের দামও বৃদ্ধি পাবে, যার সুফল পাবেন প্রান্তিক কৃষকেরা।
এদিকে খালিশপুর জুট মিল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি আবু দাউদ দ্বীন মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, মিলগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা ছিল। তার দাবি, পাট কেনার মৌসুমে প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। তিনি আরও বলেন, বহু যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়ার কারণে কিছু মিল ভবিষ্যতে চালু করতে হলে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন হবে।
পাটকল সিবিএ–নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক খলিলুর রহমান বলেন, মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু শ্রমিক এখন বেকার জীবনযাপন করছেন। কেউ দিনমজুরের কাজ করছেন, কেউ কাজ পাচ্ছেন না। অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাতেই চালু করা উচিত ছিল। যেসব মিল বন্ধ হয়েছে, সেগুলো আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালু করার সুযোগ এখনো রয়েছে।

