প্রচলিত পশ্চিমা বাজারের বাইরে রপ্তানি সম্প্রসারণে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা এবার মিশ্র ফলাফল দেখাচ্ছে। কিছু দেশে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, আবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত বাজারে প্রবৃদ্ধি কমেছে। ফলে বাজার বহুমুখীকরণের লক্ষ্য কতটা সফল হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। তবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ও রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি কমেছে।
এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং রপ্তানিমুখী অর্থায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ৭৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। ওভেন পোশাক, নিটওয়্যার, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য এবং জুতার রপ্তানি বৃদ্ধিই এ সাফল্যের মূল চালিকা শক্তি। একই সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় বাংলাদেশি পণ্যের বাড়তে থাকা চাহিদার ইঙ্গিত দেয়। তবে সামগ্রিক চিত্র এতটা আশাব্যঞ্জক নয়।
জুলাই-মে সময়ে ১৬১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অপ্রচলিত রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে অক্ষুণ্ন রয়েছে। তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারিত হলেও দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি ৮ দশমিক ৬২ শতাংশ কমে ৭৭ কোটি ৪০ লাখ ৪ হাজার ডলারে নেমে এসেছে। তুরস্কে রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি ৪৫ লাখ ৭০ হাজার ডলারে। চলমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে রাশিয়ার বাজারেও, যেখানে রপ্তানি সংকুচিত হয়েছে।
দেশভিত্তিক এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা গেছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সংকলিত ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-মে সময়ে অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
শুধু অপ্রচলিত বাজার নয়, প্রচলিত বাজারেও কিছুটা চাপ দেখা গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। দেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি প্রায় স্থিতিশীল থাকলেও ০ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে কানাডায় রপ্তানি ২ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যে রপ্তানি কমেছে ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং তা দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও মূলত শ্রমনির্ভর ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের বাজারে প্রধানত পোশাক, পাটপণ্য, চামড়াজাত পণ্য, তুলাজাত পণ্য ও প্লাস্টিক রপ্তানি হয়। অস্ট্রেলিয়ায় পোশাক ও হোম টেক্সটাইলের আধিপত্য রয়েছে। তুরস্কেও নিটওয়্যার, ওভেন পোশাক এবং পাটজাত পণ্যই রপ্তানির মূল অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে চীন। সেখানে পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার এবং পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজারে পণ্য বৈচিত্র্যের আরও বড় সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে অপ্রচলিত বাজারের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। তবে অনেক দেশে ক্রেতাদের রপ্তানি ঋণসুবিধা সীমিত থাকায় রপ্তানিকারকদের নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তার মতে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে। তবে বাজার বহুমুখীকরণের গতি আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
মাহমুদ হাসান খান সতর্ক করে বলেন, এলডিসি উত্তরণের আগে পর্যাপ্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করা এবং অপ্রচলিত বাজার থেকে রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব না হলে দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। এজন্য প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারি সহায়তা, উন্নত বাজারপ্রবেশ সুবিধা এবং কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতির প্রয়োজন রয়েছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হকের মতে, নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, জাপানে উল্লেখযোগ্য রপ্তানি বৃদ্ধির আগে রপ্তানিকারক, শিল্প সংগঠন এবং সরকারি সংস্থাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও রাশিয়ার মতো বাজারেও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, তুরস্কের উচ্চ আমদানি শুল্ক এবং ভারতে বাজারপ্রবেশসংক্রান্ত বাধার মতো বিষয়গুলো সমাধানে সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে আরও কার্যকর আলোচনা জরুরি। তার মতে, রপ্তানি প্রণোদনার পাশাপাশি ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি অর্জন এবং বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।
তার ভাষ্য, ভবিষ্যতে শুধু পোশাক খাত বা কয়েকটি নির্দিষ্ট বাজারের ওপর নির্ভর করে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে না। এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি সক্ষমতা বজায় রাখতে হলে পণ্য বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে, শক্তিশালী বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে এবং উৎপাদনশীলতা ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি আরও প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হারও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সর্বশেষ তথ্য বলছে, রপ্তানি বহুমুখীকরণ কৌশল কিছু বাজারে ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে, বিশেষ করে চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। তবে সব অপ্রচলিত বাজারে একই ধরনের সাফল্য পাওয়া যায়নি। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমানো এখনও সম্ভব হয়নি। এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতি এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করাই হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

