চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও বাণিজ্যিক শক্তি। বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য সম্পর্ক বহু বছর ধরেই বিস্তৃত ও বহুমুখী। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বেড়েছে। এই ঘাটতি কমাতে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী করার পরামর্শও এসেছে।
চীন সফরকে ঘিরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, রপ্তানিকারক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, এই সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে চীনে রপ্তানি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। এজন্য বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, চীনের বাজারে প্রবেশ সহজ নয়। সেখানে প্রতিযোগিতা তীব্র। তাই পণ্যের গুণগত মান বাড়ানো এবং নতুন নতুন পণ্য যুক্ত করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তার মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই শীর্ষ দেশের সঙ্গে ঘাটতি কমানো কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।
চীন সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে চীন ৯৮ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, পাটজাত দ্রব্য, ওষুধ ও প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে চামড়া, ওষুধ, সৌর প্যানেল ও ইলেকট্রনিকস খাতে বিনিয়োগ বাড়লে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং সেই পণ্য চীনে রপ্তানি করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে।
এছাড়া প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চীনে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ৩০টি নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন, চীনের অর্থায়নে বাংলাদেশে ২০টি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা এবং যৌথ উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব কয়লা উৎপাদনের উদ্যোগ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত সুতা, কাপড়, রাসায়নিক ও যন্ত্রপাতির বড় অংশই আসে চীন থেকে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে চীনা প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির ব্যবহারও বাড়ছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, আর চীন থেকে আমদানি ১৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারে।
তিনি বলেন, চীনের বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য পণ্যের মান বাড়ানো, বাজার বিশ্লেষণ জোরদার করা এবং শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার রপ্তানি বাড়ানোর ওপরও তিনি জোর দেন। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য সম্পর্ককে শুধু আমদানি নির্ভর কাঠামো থেকে সরিয়ে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরভিত্তিক ব্যবস্থায় নিতে হবে। তাহলেই দীর্ঘমেয়াদে ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি–এর সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, দেশের অনেক রপ্তানি পণ্য আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে চীনের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে সমস্যা হচ্ছে। রপ্তানি বাড়াতে মান উন্নয়ন জরুরি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান–এর সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, চীনে রপ্তানি বাড়াতে হলে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, বৈচিত্র্য এবং বিপণন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা বাড়িয়ে শিল্প খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে।

