প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে নানা উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। সহজ শর্তে ঋণ, বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, কর সুবিধা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির মতো নানা প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কেবল বাজেটে ঘোষণা দিলেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন উইমেন এন্টারপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়াল বলেন, দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। প্রায় প্রতিটি অর্থবছরেই নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন উদ্যোগের ঘোষণা আসে। তবে বাস্তবে সেসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়েছে এবং নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে কতটা ভূমিকা রেখেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নারী উদ্যোক্তাদের অন্যতম বড় সংকট এখনো পুঁজি ঘাটতি। পাশাপাশি পারিবারিক বাধা, ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, পণ্য পরিবহনের সমস্যা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব, বিপণন সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের হলেও কার্যকর সমাধান এখনও দৃশ্যমান নয়। তাই শুধু অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, সমস্যাগুলোর বাস্তব সমাধান এবং তদারকি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। নাসরিন ফাতেমা আউয়াল আরও বলেন, অনেক সময় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল পৌঁছায় না। ফলে বছরের পর বছর বাজেট পরিবর্তন হলেও নারী উদ্যোক্তাদের মৌলিক সমস্যাগুলো একই রয়ে যাচ্ছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্টার্টআপ খাতের জন্য ৪০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই তহবিলে নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নারী পরিচালিত ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প এবং নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল বিপণন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জোরদারের লক্ষ্যে ১২৫ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ১০ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য ১ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিল গঠন করা হয়। নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ও সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পৃথক ডেস্ক এবং বিশেষ ঋণ কর্মসূচি চালু রাখা হয়। এছাড়া করমুক্ত বার্ষিক টার্নওভারের সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হয়। তৃণমূল পর্যায়ে নতুন নারী উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার কথাও উল্লেখ করা হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটেও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আয়কর সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই অর্থবছরে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জেন্ডার বাজেটে ৪ লাখ ৫৪ হাজার ২১১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়, যা ৪৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫ হাজার ২২২ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রস্তাব করা হয়। গ্রামীণ ও নতুন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং ই-কমার্স ও ডিজিটাল বিপণনে সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছিল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের অর্থনীতিতে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা সম্প্রসারণ, ফ্রিল্যান্সিং এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর পুনরাবৃত্তি দীর্ঘদিন ধরে চলমান। তাই এসব সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে দেশে প্রায় ২৮ লাখ নারী পরিচালিত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ রয়েছে। মোট এসএমই প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ নারীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও অধিকাংশ উদ্যোগ ক্ষুদ্র পরিসরেই সীমাবদ্ধ। ফলে সেগুলো বড় ব্যবসায় পরিণত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও সেই উদ্যোগকে টেকসই ও সম্প্রসারণযোগ্য ব্যবসায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন ওয়েবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ এখনও ই-কমার্সের সুযোগ-সুবিধার বাইরে রয়েছে। প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানো গেলে তাদের অনলাইন ব্যবসায় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। অনেক নারী উদ্যোক্তা সারা বছর সঞ্চিত পুঁজি দিয়ে পণ্য উৎপাদন করলেও বিপণনের অভাবে কাঙ্ক্ষিত বাজার পাচ্ছেন না। এসব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী ব্যবসায় সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হতে পারছেন না। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের ডিজিটাল বিপণনে দক্ষ করে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, উৎপাদন উপকরণ সরবরাহ এবং ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের কুটিরশিল্পে সম্পৃক্ত করা, তাদের উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানিতে ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বজায় রাখা এবং দেশি-বিদেশি বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ওয়ান-স্টপ সেবা চালু এবং জেলা পর্যায়ে বিপণন কেন্দ্র স্থাপনেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

