বিগত সরকারের সময় নেওয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০ উন্নয়ন প্রকল্পকে বর্তমান সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক বোঝা হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর মতে, এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর কাজ অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হওয়ায় সেগুলো বাতিল করাও সম্ভব নয়, আবার বর্তমান বাস্তবতায় সহজে এগিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ মিলনায়তনে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ এবং সঞ্চালনা করেন সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার পূর্ববর্তী সময়ের ১ হাজার ৩০০ উন্নয়ন প্রকল্পের উত্তরাধিকার পেয়েছে। এর অনেকগুলোর বাস্তবায়ন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত এগিয়েছে। ফলে প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বর্তমান সরকারের জন্য বড় দায়ে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত ১৫ বছরে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্প এখন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কিছু প্রকল্প বাদ দেওয়া সম্ভব হলেও সবগুলো বাতিল করার সুযোগ নেই।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নসংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকার প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন চিন্তা ও নতুন অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
বাজেটের মূল দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি একটি পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, যেখানে শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো বেশি সুবিধা পেলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে থেকে গেছে। তিনি জানান, কামার, কুমার, তাঁতী, কুটিরশিল্প উদ্যোক্তা, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক মূলধারায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও সক্রিয় করতে পরিবার কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় চাহিদা ও উৎপাদনশীলতা উভয়ই বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকঋণের বোঝা অনেক কৃষকের পক্ষেই বহন করা কঠিন। দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফ করতে হয়েছে। এ কারণে ঋণনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে কৃষকদের সার, বীজসহ মৌলিক উপকরণ সরবরাহে সহায়তা দিতে কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারছে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাত প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় কমবে এবং সঞ্চয়ের সুযোগ বাড়বে। তিনি আরও বলেন, দেশের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি, মৃৎশিল্প ও তাঁতশিল্পকে নতুনভাবে বাজারজাত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পণ্যকে আন্তর্জাতিক অনলাইন বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সাংস্কৃতিক শিল্পের বিকাশে সরকার পূর্বাচলে একটি ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বলেও জানান তিনি। এর মাধ্যমে সংগীত, নাটক ও চলচ্চিত্রকে আরও বাণিজ্যিকভাবে সফল করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।
রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও সরকারি অর্থায়ন কমে আসছে। এ অবস্থায় বড় বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, পুঁজিবাজারে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বিভিন্ন আইন ও করব্যবস্থায় সংস্কার কার্যক্রম চলছে। এসব উদ্যোগের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, জেপি মরগ্যানসহ বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষ তহবিল ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে, যা দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক লক্ষ্যে সহায়ক হতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারকে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। তারপরও আগামী দিনে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ব্যবহৃত হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ সরাসরি এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করবে। কোনো প্রকল্পে অগ্রগতি থেমে গেলে বা অনিয়ম দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সেটি দৃশ্যমান হবে এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
বাজেটের অন্তত ৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে অংশ নেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শারমিন্দ নীলোর্মি, বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল এবং বুয়েটের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম।

