দেশে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটলেও সরকারি বড় প্রকল্পগুলোতে এখনও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাচ্ছে না স্থানীয় নির্মাতারা। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা সরকারি ক্রয়নীতির কারণে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগের গতি কমছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়ছে।
দেশের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর সম্প্রসারণ এবং বৈদ্যুতিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে গত এক দশকে ভারী বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে বাণিজ্যিক মানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, শিল্প খাতের চিলার, ভিআরএফ সিস্টেম এবং লিফট উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে কয়েকটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সরকারি প্রকল্পে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তারা এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি।
শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের মতে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা দেশের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভারী বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের জন্য আলাদা কোনো সনদায়ন কাঠামো না থাকায় সরকারি সংস্থাগুলো এখনও পুরোনো শ্রেণিবিন্যাস ও রেট শিডিউলের ওপর নির্ভর করছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইলেকট্রনিকস ও বৈদ্যুতিক পণ্যের বার্ষিক বাজার ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত এক দশকে এই খাতে ১০ হাজার কোটিরও বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। তবু স্থানীয় শিল্পের এই অগ্রগতি সরকারি ক্রয়নীতিতে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে বিএসটিআই গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক পণ্যের সনদ দিলেও বৃহৎ বাণিজ্যিক এইচভিএসি সিস্টেম, শিল্প চিলার বা লিফটের জন্য কোনো পৃথক সনদায়ন ব্যবস্থা নেই। ফলে সরকারি সংস্থাগুলো গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিদ্যমান রেট শিডিউল অনুসরণ করে, যা শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে মূলত দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর পক্ষে কাজ করে।
সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০০৮-এর আওতায় থাকা শিডিউল অব রেটস অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতার চেয়ে তাদের বয়স, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ব্যবস্থায় আমেরিকা ও ইউরোপের ব্র্যান্ডগুলোকে ‘ক্যাটাগরি এ’ এবং চীন ও জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ক্যাটাগরি বি’তে রাখা হয়েছে। বিপরীতে অধিকাংশ বাংলাদেশি ও ভারতীয় কোম্পানি এখনও ‘ক্যাটাগরি সি’ বা ‘ডি’তে অবস্থান করছে।
শিল্প প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি সময়ের কার্যক্রম থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ক্যাটাগরি এ’ এবং ৩০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ক্যাটাগরি বি’তে স্থান পায়। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ নির্মাতা গত এক দশকে উৎপাদনে এসেছে। ফলে তারা শুরু থেকেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে।
ভিশন ইলেকট্রনিক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল বলেন, দেশে এখন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইউরোপ ও আমেরিকার মানের বাণিজ্যিক এসি ও লিফট উৎপাদনে সক্ষম হলেও সরকারি রেট শিডিউলের কারণে বড় প্রকল্পে সরবরাহের সুযোগ পাচ্ছে না। তাঁর মতে, এই শ্রেণিবিন্যাস শুধু সরকারি প্রকল্পেই নয়, বেসরকারি খাত এবং রপ্তানি বাজারেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি জানান, সম্প্রতি চীনের একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রদর্শনীতে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশি পণ্যের প্রতি আগ্রহ দেখালেও দেশে বড় প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকা এবং সুনির্দিষ্ট সনদায়ন ব্যবস্থার অভাব বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
সক্ষমতা আছে, তবু আমদানিনির্ভরতা:
চলতি বছরের শুরুতে আটটি বিভাগীয় বিশেষায়িত হাসপাতালের জন্য কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডানহাম-বুশের সঙ্গে চুক্তি করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণের জন্য আটজন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র সফরও করেন।
স্থানীয় নির্মাতাদের দাবি, এ ধরনের এইচভিএসি ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে অন্তত চার থেকে পাঁচটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এইচভিএসি ও শিল্প চিলার উৎপাদন করছে। কিন্তু নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারি প্রকল্পে তারা অংশ নিতে পারছে না। খাতসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি ও উৎপাদন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
ওয়ালটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মুর্শেদ বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের অতীত ইতিহাস নয়, বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই ক্রয় সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত। তিনি প্রস্তাব দেন, প্রয়োজন হলে বুয়েট বা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যের মান যাচাই করা যেতে পারে। নির্ধারিত মান পূরণ করলে দেশীয় নির্মাতাদেরও সমান সুযোগ দেওয়া উচিত। তাঁর মতে, শিল্পনীতি যেখানে আমদানি-প্রতিস্থাপনকারী শিল্পকে উৎসাহিত করছে, সেখানে বর্তমান ক্রয়নীতি সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লিফট শিল্পেও একই বাস্তবতা:
এলিভেটর শিল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান তালিকায় ওটিস, শিন্ডলার, কোনে ও মিতসুবিশির মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে শীর্ষ পর্যায়ের সরবরাহকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লিফটগুলো নিম্ন শ্রেণিতে রয়ে গেছে। শিল্প প্রতিনিধিদের মতে, এর ফলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সরকারি দরপত্রে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শুরুতেই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যায়।
আর এন পালের ভাষ্য, একই মানের দেশীয় পণ্য শুধু শ্রেণিবিন্যাসের কারণে কম মানসম্পন্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অথচ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যেই উচ্চগতির লিফট পরীক্ষার টাওয়ার স্থাপন করেছে এবং বেসরকারি বহুতল ভবনে লিফট সরবরাহের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে। তবুও বিদ্যমান নিয়মে দেশীয় লিফটের ব্যবহার প্রায় ছয়তলা পর্যন্ত ভবনে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
আর্নেস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, প্রাণ-আরএফএল ও ওয়ালটনসহ কয়েকটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইউরোপীয় নিরাপত্তা সনদ অর্জন করেছে। কিন্তু পুরোনো বিধিমালার কারণে এসব পণ্য এখনও অনেক সরকারি প্রকল্পে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে না।
নীতিগত সংস্কারের দাবি:
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ৮ থেকে ১০ হাজার লিফটের চাহিদা রয়েছে। আরএফএল বছরে প্রায় ১ হাজার এবং ওয়ালটন প্রায় ২ হাজার লিফট উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এদিকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে দেশের এয়ার কন্ডিশনার বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ ইউনিট এসির চাহিদা তৈরি হয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশ স্থানীয় নির্মাতারাই সরবরাহ করছে। তবে ভিআরএফ ও শিল্প চিলার খাতে দেশীয় কোম্পানিগুলোর অংশীদারিত্ব এখনও মাত্র ১০ শতাংশের মতো। কারণ সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্পগুলো এখনও আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল।
বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন ভিআরএফ ও চিলার সিস্টেমের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এর বড় অংশ উৎপাদন করা গেলে প্রায় ১৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তি খাত দেশের অন্যতম উদীয়মান শিল্পে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে উদ্যোক্তারা ব্যাপক বিনিয়োগ করেছেন। এখন সেই বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেয় বা সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান কাঠামো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি ব্র্যান্ডের তুলনায় কম প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রাখছে।
অন্যদিকে বিএসটিআইয়ের সনদায়ন বিভাগের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বৃহৎ শিল্পকারখানার এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা ও লিফট পরীক্ষার সক্ষমতা বিএসটিআইয়ের নেই। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো সংস্থার সনদ থাকলে তা গ্রহণ করে পণ্যের অনুমোদন দেওয়া হয়। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যার মূল কারণ বর্তমান ক্রয়বিধি। সেটি সংস্কার না হলে দেশীয় ভারী বৈদ্যুতিক শিল্পের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকিউরমেন্ট ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশিক আহমেদ শিবলী স্বীকার করেন, বর্তমান কাঠামো ২০১১ সালের বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল এবং এখন তা হালনাগাদের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি জানান, ক্রয়নীতির সংস্কার নিয়ে কাজ চলছে এবং স্থানীয় নির্মাতারা মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে ভবিষ্যতে তাদের আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

