বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ। বর্তমানে তিনি ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও সামলেছেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
নতুন সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট, অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং বিভিন্ন নীতিগত বিষয় নিয়ে তিনি নিজের মতামত ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার অনেকগুলো লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ২০৩৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণে অনেকগুলো কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন হবে। সরকারের এসব লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন?
স্বপ্নটা ঠিক আছে। তবে শুধু আশাবাদ ব্যক্ত করলে হবে না। যেমন অর্থমন্ত্রী ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের’ কথা বলেছেন। অর্থনীতিকে ডিরেগুলেশনের কথা বলেছেন। এটিই ইজ অব ডুয়িং বিজনেস। ব্যবসার জন্য এত শর্তাবলি আর এতগুলো জায়গার অনুমোদন নেয়ার ভোগান্তি এড়িয়ে একটি জায়গা থেকেই সব সেবা পাওয়ার সুবিধা দেয়া। অবশ্যই ব্যবসা সহজ করতে হবে। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নিতে হলে বিনিয়োগও ৩২-৩৪ শতাংশে হতে হবে। সচরাচর এ বিনিয়োগের দুই-তৃতীয়াংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। বাকি এক অংশ আসে সরকারি খাত থেকে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেসরকারি খাত অনেকটা ঘুমিয়ে আছে। দুই-চার বছর ধরে তারা বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ করছে না। এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রাপ্তি দেশের অর্থনীতির ইতিহাসে সর্বনিম্ন। সেটি ৬ শতাংশের চেয়ে কম। এ অবস্থায় বেসরকারি খাতকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে তার দিকনির্দেশনা বাজেটে খুব বেশি চোখে পড়েনি। কিন্তু এ কাজটা অবশ্যই করতে হবে। সরকারি খাত অবশ্যই পরিচালনায় থাকবে। সমস্যা হলো রাজস্ব আয়ের ৭২ শতাংশই খরচ হয় পরিচালন ব্যয়ে। অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরে এ ব্যয় কমিয়ে ৬৪ শতাংশে নিয়ে আসার কথা বলেছেন।
এমনটি করতে পারলে ভালো। কারণ সরকারের আকার বিবেচনায় গোটা ব্যবস্থাটিকে ফিডিং করার জন্য যে রাজস্ব দরকার তার পরিমাণ অনেক বেশি। এজন্যই আমরা উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ পাই না। গত ১০ বছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে ওই অনুপাতে উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ বাড়েনি। আমরা সরকারের আকার বাড়িয়েছি। এত বড় সরকার কাঠামো, এতগুলো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর কিংবা নির্দেশক আমাদের প্রয়োজন নেই। এ দীর্ঘ সময়ে আমরা অনেক স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ করেছি। সেখানেও খরচ বেড়েছে। এর খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।
কারণ এত বড় একটি কাঠামোর খরচ মেটানোর জন্য রাজস্বের ওপর নির্ভর করতে হবে। এখন সাধারণ মানুষ এত কর কোথা থেকে দেবে? এনবিআর তো সবখানেই কর বসাচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হলে কর আদায়ও কম হবে। কারণ অর্থনীতিকে বড় হওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। সুদের হার বেশি, বিনিয়োগ বলতে কিছুই নেই এবং নতুন কর্মসংস্থানও ওইভাবে তৈরি হচ্ছে না। এখন এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ের একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। তারা লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য ডানে-বামে সবখানেই কর বসাচ্ছে।
পুঁজিবাজারের কথাই ধরা যাক। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, পুঁজি সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম পুঁজিবাজার। সেখানে কী করা হলো? আগে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর রেয়াত মিলত। আগে ১০ লাখ টাকার ওপর হলেও এবারের প্রস্তাবনায় তা সাড়ে ৭ লাখ করা হয়েছে। এছাড়া শেয়ারবাজারের প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিভিডেন্ড ইনকাম অর্থাৎ বিনিয়োগের ওপর যে আয় হয় ওপর ২০ শতাংশ কর ধার্য ছিল, এখন বাড়ানো হয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে কোনো ধরনের কর ছাড় দেয়া হয়নি। আমাদের প্রস্তাবনা ছিল, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স ১০ শতাংশ কম হোক। এ বিষয়ে কোনো ধরনের পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তাই শুধু কথা দিয়ে তো কাজ হবে না। তা পূরণে কাজ করতে হবে।
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের ক্ষেত্রে এ ঘাটতির পরিমাণ অনেক। এটি কি বাজেট লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চ্যালেঞ্জ হতে পারে?
সরকারের বাজেট ঘাটতি অনেক বেশি। সরকার যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা অর্জন সম্ভব না। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হলে একটা সম্ভাবনা আছে। দেশের অর্থনীতি ঝিমিয়ে আছে। অর্থনীতির গতির ওপর ভর করেই মূলত রাজস্ব আয় বাড়ে। এখন তা করা যাচ্ছে না। এজন্যই এমন অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা দেয়া ঠিক না। তার পরও সরকার প্রত্যেক বছর একটা লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়।
প্রতিবারই আগেরবারের তুলনায় বেশি লক্ষ্য বেঁধে দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের এখনকার রাজস্ব আয়ের কাঠামো দিয়ে তা সম্ভব না। শেষ পর্যন্ত ওই ঘাটতি বাজেটের ওপরই নির্ভর করতে হবে। আগে হোক বা পরে হোক, এনবিআরকে তো একটা যুক্তিযুক্ত কর কাঠামোর দিকে এগোতে হবে। কর বাড়ালেই হবে না। বরং এখানে-সেখানে কর বসিয়ে সমস্যা আরো বাড়ানো হচ্ছে।
বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য এখন সরকারকে ঋণ নিতে হয়। এ ব্যয়ের একটি বড় অংশ যায় সুদ পরিশোধে। এ সুদের পরিমাণ আগামী অর্থবছরে তো কমবেই না, বরং উল্টো বাড়বে। এভাবে বছরের পর বছর বাড়তেই থাকবে। এ সুদ পরিশোধের পরিমাণ কমানোর একটিই উপায় রয়েছে। সেটি হলো ঘাটতি বাজেটের আকার কমিয়ে আনা। নতুন অর্থবছরে ঘাটতি বাজেট কমিয়ে আনার ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, ঘাটতি বাজেট জিডিপির ৪ শতাংশের নিচে রাখার চেষ্টা করবেন। প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করতে পারবেন তা এখনই বলা যাচ্ছে না। দেশের অর্থনীতি ১০ বছর ধরেই ধুঁকে ধুঁকে চলছে ও কর্জের ভেতর ডুবে গেছে। বর্তমানে অবস্থা এমন যে আমরা একেবারে খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছি।
সরকারের পরিচালন ব্যয় প্রতি বছরই বাড়বে। এখানে যত ঋণ নেয়া হবে তত সুদ পরিশোধ করতে হবে। এভাবে সুদ বাড়তে থাকলে তো ব্যয় বাড়বে। তখন আমরা এক ধরনের জাঁতাকলে পড়ে যাব। এগুলো এড়ানোর জন্যই অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে হবে। পরিচালন ব্যয়ের সমন্বয়, বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশে কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের পরিবেশ গড়ে দিতে হবে। তাদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দিলে তো হবে না। এখন পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে যদি ঋণকে মনেটাইজেশন করা শুরু হয়, টাকা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তাহলে তা সবার জন্যই নেতিবাচক ফল আসবে।
সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার বিষয়টিই বেশি আলোচনায় রয়েছে। বৈদেশিক ঋণ নেয়ার কথা থাকলেও অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকেই তা নেয়া হবে বেশি। এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে না?
সরকারকে তো ঋণ নিতেই হবে। কিন্তু এ ঋণ নেয়ার একটা সীমা থাকা উচিত। এজন্যই বলছি, নিষ্ক্রিয় সম্পদগুলোকে বিক্রি করে দিয়ে আয় বাড়াতে হবে। এখন সরকার বিদেশী ও অভ্যন্তরীণ—এ দুই খাত থেকে ঋণ নেয়ার কথা ভাবছে। তার মধ্যে ৪৬ শতাংশ ঘাটতি মেটানো হবে বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে। কিন্তু বিদেশী ঋণদাতা অর্থায়নে রাজি না হলে কী হবে? ব্যাংকগুলোর অবস্থা অনেক খারাপ। এ খাতে তারল্য সংকট রয়েছে।
সরকারি ব্যাংক বাদে অনেক বেসরকারি ব্যাংকের সামনেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাঁচটি মূলধারার ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর নানা জটিলতা দেখা দেয়। একীভূত করা ব্যাংকটিতে ৪০ হাজার কোটি টাকা পুনর্ভরণ করতে হবে। বিগত সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বহু অর্থ পাচার হয়ে গেছে। গ্রাহক বা আমানতকারীদের জমানো টাকাই লুটেরা নিয়ে গেছে। কিন্তু এ লুটের ভার বহন করতে হচ্ছে জনগণকে। শুধু ইসলামী ব্যাংকের কথাই ধরা যাক। গ্রাহক ও আমানতের দিক থেকে সবচেয়ে বড় ব্যাংক।
ব্যাংকটিতে ১ লাখ কোটিরও বেশি সঞ্চয় রয়েছে। এ ব্যাংকটি যদি দেউলিয়া হয়ে যায় তাহলে এত বিপুলসংখ্যক আমানতকারীর টাকা কে ফেরত দেবে? তাই সরকারকে অনেক সতর্কভাবে এসব বিষয়ে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে যাদের দায়িত্ব দিলে ইতিবাচক ফল মিলবে তাদেরই এসব সমস্যা সমাধানের জন্য নিযুক্ত করতে হবে। ব্যাংক, শিল্প খাত কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দল বা পার্টির কার্যক্রম না করাই ভালো। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। সরকারের কাজ আসলে বাণিজ্য করা না। এখানে সরকার সহায়তা দেবে। সাধারণ মানুষও ফল চাইবে। তারা দেখবে মূল্যস্ফীতি কমছে কিনা, কর্মসংস্থান বাড়ছে কিনা।
প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের অবদানটাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া জরুরি। অথচ বেসরকারি খাতের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলায় সরকার কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে?
বেসরকারি খাতের নেতৃত্বস্থানীয়দের সঙ্গে বসে তাদের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার কথা শুনতে হবে এবং তার সমাধানে কাজ করতে হবে। ভারতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার পলিসি রেট অর্থাৎ রেপো রেট ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আর আমাদের এখানে তা ১০ শতাংশ। রেপো রেটের হার বাংলাদেশে অনেক বেশি। এটা কমাতে হবে। বেসরকারি খাত এখন ঋণ নিচ্ছে না। তাই সরকারকে বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে এ খাতের উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে হবে।
ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতের অবস্থা ভালো হলে তারাই সরকারের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে শুরু করবে। বেসরকারি খাত এগিয়ে আসতে শুরু করলে সরকারও আর্থিকভাবে এগিয়ে যেতে শুরু করবে। তখন বিদেশীরাও আকৃষ্ট হবে। তারা পোর্টফোলিও ইনভেস্টর হিসেবে এখানে আসবে এবং প্রজেক্টভিত্তিক অর্থায়নও শুরু হবে। কিন্তু সরকার যদি সফলভাবে বিড করতে না পারলে তাহলে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা যাবে না। ফলে কর আদায়ও বাড়বে না, বাজেট ঘাটতি চড়া হতে শুরু করবে এবং মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে শুরু করবে।
নানা আঙ্গিক বিবেচনা করলে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির যে অবস্থা তা আসলে খুব বেশি নয়। আরো বিনিয়োগের মাধ্যমে যদি সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যায় তাহলে অর্থনীতিতে গতি আসবে। তখন মূল্যস্ফীতি না কমলেও বাড়বে না। এজন্যই বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সরকারকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। একসময় বেসরকারি খাতই সরকারের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে। দেশেই অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান আছে। তাদের প্রণোদনা দিতে হবে।
জ্বালানি সংকটের এ সময়ে সরকার এ খাত নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা বলছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
জ্বালানি খাতের মূল সমস্যাই হলো অনিয়ম। এমনটা অনেক আগ থেকে হয়ে আসছে। জ্বালানি খাতে বহু আগ থেকে এ সমস্যাটা তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারের জ্বালানি খাত নিয়ে যে লক্ষ্য রয়েছে তা সফল হবে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ২০ শতাংশে নেয়া যায়। আমাদের এখন নিষ্ক্রিয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকেই ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
এসব সমস্যা নিয়ে তো বহু আগেই চিন্তা করা প্রয়োজন ছিল। সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রাখার পরও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে উৎসাহ দেয়ার সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক ফল আনেনি। পুরনো যন্ত্রপাতি এনে অনেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়েছে। পরবর্তীতে সরকার দেখল, এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নিলে খরচ বেশি হবে, বরং এগুলোকে বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিলে খরচ কম হবে। এভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে আমাদের সবসময় কপাল পুড়েছে।
আপনি সরকারকে বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে নেতৃত্ব দেয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরাই তো আগ্রহী নন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তেমন দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আসেনি। নতুন সরকারের সামনে বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে করণীয় কী?
দেশী বিনিয়োগকারীরা তো বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন যখন সরকার এ বিষয়ে নড়েচড়ে বসবে। যখন সরকার নিজেই বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিবে তখন দেশীরা এগিয়ে আসতে শুরু করবেন। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নানা কারণে আইপিও আসেনি। তবে নতুন সরকারের গঠিত কমিশন ভবিষ্যতে আইপিও আনার চেষ্টা করবে এ প্রত্যাশা আছে। আবার আইপিওর মাধ্যমে যদি কিছু না-ও আসে অন্তত ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে কিছু শেয়ার বিক্রি করুক সরকার। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো জানাচ্ছে তাদের পুঁজির দরকার নেই।
সেক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে তারা সে অর্থ নিয়ে যেতে পারে। তবে এখানে কোম্পানি আসবে। এসব উদ্যোগ শুরু করতে হবে। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হবে না। সরকারকে তো আয় করতে হবে। সেজন্য যেখানে-সেখানে কর বাড়ানোর প্রয়োজন আসলে নেই। এটা ভুলে গেলে চলবে না সরকারের অনেক নিষ্ক্রিয় সম্পদ রয়েছে। সেগুলোকে বিক্রি করে আয়ের পরিসর বাড়ানো যেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিক্রিতব্য সম্পদগুলো চিহ্নিত হয়েছে। নতুন সরকারকে তাই বাড়তি পরিশ্রম করতে হবে না। তারা সঠিক পদক্ষেপ নিলেই হলো। সরকারের নিষ্ক্রিয় সম্পদ ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে বিক্রি করে দিতে হবে। অনেকেই বিনিয়োগ করার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনেক কলকারখানা রয়েছে। এগুলোর পরিচালন ব্যয় সরকারকে বহন করতে হয়। এগুলোকে সরকার চাইলে বিক্রি করে দিতে পারে।
বিশ্বের অনেক স্থানে বড় বড় অবকাঠামো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এটা কোম্পানি করে হতে পারে কিংবা সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমেও হতে পারে। এখন এখানে দুইটা পদ্ধতি আছে। কোম্পানি করে আইপিও বিক্রি করা যেতে পারে। আরেকটা হলো কোম্পানির মাধ্যমে বন্ড বিক্রি করা। এক্ষেত্রে আগামী কয়েক বছরে ক্যাশফ্লোর বিপরীতে বন্ড বিক্রি করে জনগণ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা যেতে পারে। সংগৃহীত এ অর্থ সরকার বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারে। সূত্র: বণিক বার্তা

