২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। অর্থের অঙ্কে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। ঘোষণার পর থেকেই বাজেটের ব্যাপ্তি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে এত বড় ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই সরকার কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না। ফলে এত বড় বাজেটের অর্থায়ন নিয়ে সংশয় স্বাভাবিক।
এসব প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাজেটকে আরেকটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যায়। আমরা সাধারণত বাজেটকে রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা হিসেবে দেখি। অনেক সময় এটি রাজনৈতিক অগ্রাধিকার কিংবা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রূপরেখা হিসেবেও বিবেচিত হয়। কিন্তু বাজেটকে যদি একটি চলমান পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর অর্থ আরও গভীরভাবে বোঝা সম্ভব।
বাজেটে যে সংখ্যাগুলো লেখা থাকে, সেগুলো কেবল হিসাবের অঙ্ক নয়। প্রতিটি বরাদ্দের পেছনে থাকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা, মানুষের আচরণ নিয়ে কিছু অনুমান এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল প্রত্যাশা। নতুন কোনো কর্মসূচি চালু করা বা বিদ্যমান কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর সময় নীতিনির্ধারকেরা মূলত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু অনুমানের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় সেই অনুমানের সঙ্গে মেলে না।
কোনো নীতি প্রত্যাশিত ফল দেবে কি না, একটি প্রকল্প মানুষের আচরণে কতটা পরিবর্তন আনবে, বিনিয়োগ বাড়াতে কোনো প্রণোদনা কার্যকর হবে কি না কিংবা সামাজিক কর্মসূচি মানুষের জীবনমান উন্নত করবে কি না—এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর আগে থেকেই জানা সম্ভব নয়। তাই নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, দুটিই অনিশ্চয়তায় ভরা একটি যাত্রা।
বাইরে থেকে অনেক সময় মনে হয়, নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত। বাস্তবে সব সময় তা নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন বা কারিগরি বিশেষজ্ঞ—সবার কাছেই কিছু তথ্য, বিশ্লেষণ ও অভিজ্ঞতা থাকে। কিন্তু ভবিষ্যতের পূর্ণ চিত্র কারও হাতেই থাকে না।
এ কারণে নীতিনির্ধারণকে অনেকটা অজানা সমুদ্রে যাত্রার সঙ্গে তুলনা করা যায়। গন্তব্য নির্ধারিত থাকলেও পথের স্রোত, ঝড় কিংবা নতুন পরিস্থিতি আগে থেকে নিশ্চিতভাবে অনুমান করা যায় না। তাই অনেক নীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচিকে একটি পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যৌক্তিক। আর যেহেতু বাজেট এসব উদ্যোগের অর্থের জোগান দেয়, তাই এটিও এক অর্থে একটি বড় পরীক্ষার অংশ।
বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পরই প্রকৃত অভিজ্ঞতা সামনে আসে। কোথাও প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়, আবার কোথাও নতুন সমস্যা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার সঙ্গে মিললেও, অনেক সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রও দেখা দেয়। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতের জন্য নতুন শিক্ষা তৈরি করে।
যেসব সরকার সফলভাবে কাজ করে, তারা শুধু অর্থ ব্যয় করে না; বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেয়। তারা কর্মসূচি চালু করেই থেমে থাকে না, প্রয়োজনে তা সংশোধন করে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মধ্যেই তাদের সাফল্য নিহিত থাকে। সে কারণেই কোনো নীতি বা প্রকল্পের সাফল্য কেবল তার প্রাথমিক পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে না। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সক্ষমতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মানসিকতা।
সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটেও এমন কিছু উদ্যোগ রয়েছে, যেগুলোকে শুধু ব্যয় কর্মসূচি হিসেবে না দেখে শেখার একটি সুযোগ হিসেবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এভাবে বাজেটকে দেখলে এর উদ্দেশ্য ও সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ডায়নামিক সামাজিক নিবন্ধনব্যবস্থা: সামাজিক সুরক্ষায় নতুন সম্ভাবনা:
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে উল্লেখযোগ্য একটি উদ্যোগ হলো ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর)। এটি এমন একটি গতিশীল তথ্যভান্ডার, যার মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে নাগরিকেরা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য আবেদন করতে পারবেন। পরে তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে, কে প্রকৃতপক্ষে এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো সুবিধাভোগী নির্বাচনের ধরনে। এত দিন স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন বাছাইপ্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে তালিকা তৈরি করা হতো। ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি চালু হলে সেই প্রক্রিয়া বদলে যাবে। তখন নাগরিককে শুধু স্থানীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে একবার তৈরি করা স্থির তালিকার পরিবর্তে নিয়মিত হালনাগাদ হওয়া একটি তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে।
যদিও বাজেটে এই রেজিস্ট্রির বিস্তারিত কাঠামো তুলে ধরা হয়নি, অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করা যায় যে এতে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়, সম্পদ, কর্মসংস্থান, প্রতিবন্ধিতা এবং বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ হওয়ার ফলে মানুষের পরিবর্তিত আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে মিল রেখে সুবিধাভোগী নির্বাচন আরও নির্ভুল, স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এই নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। বাস্তবায়নের পরই জানা যাবে, কোনো যোগ্য ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ে যাচ্ছেন কি না, আবার অযোগ্য কেউ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন কি না। পাশাপাশি ডিজিটাল সুবিধা সব নাগরিক সমানভাবে ব্যবহার করতে পারবেন কি না, আপিল ব্যবস্থাটি কতটা কার্যকর হবে এবং স্থানীয় প্রভাব বা ক্ষমতার সম্পর্ক নতুন ব্যবস্থার মধ্যেও প্রভাব ফেলবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই মিলবে।
এই কারণেই ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রিকে একটি চলমান পরীক্ষা হিসেবে দেখা যেতে পারে। যদি এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ডিজিটাল সেবা, বিনিয়ন্ত্রণ ও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথে বাজেট:
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানিতে গতি আনতে এবারের বাজেটে বিভিন্ন বিধিনিষেধ শিথিল করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এর অন্যতম উদ্যোগ হলো বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব সেবাকে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা। পাশাপাশি অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর কথাও বলা হয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ককে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করা।
তবে শুধু কতগুলো লাইসেন্স কমানো হলো, সেটিই এই উদ্যোগের সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এই সহজ ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নতুন উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে কতটা উৎসাহিত করবে। নাকি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও পুরোনো প্রক্রিয়াই ধীরে ধীরে নতুন ব্যবস্থাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। সরকারি কর্মকর্তারা নতুন ব্যবস্থাকে কীভাবে গ্রহণ করেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে এর সুযোগ কাজে লাগায় এবং উভয় পক্ষ নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারে—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিধিবিধান শিথিল বা বিনিয়ন্ত্রণকরণও একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা। এর প্রকৃত কার্যকারিতা কেবল বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই মূল্যায়ন করা সম্ভব।
মৎস্য বিমা ও নীল অর্থনীতির নতুন উদ্যোগ:
এবারের বাজেটে নীল অর্থনীতির বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মৎস্য খাতকে বিমার আওতায় আনার পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে কৃষিঋণ, ক্ষুদ্রঋণ ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মসূচির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও, মৎস্য খাতের প্রাকৃতিক ও জৈবিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বিমা ব্যবস্থার ব্যবহার এখনো সীমিত। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার শুধু একটি নতুন কর্মসূচি চালু করতে চাইছে না; একই সঙ্গে একটি নতুন বাজারও গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। কোন ধরনের ক্ষতি বিমার আওতায় আসবে, প্রিমিয়াম কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, চাষিরা এতে অংশ নিতে আগ্রহী হবেন কি না এবং ক্ষতিপূরণের দাবিগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে কি না—এসব বিষয় এখনো অনিশ্চিত। এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল বাস্তব প্রয়োগের মধ্য দিয়েই পাওয়া যাবে। ফলে এই উদ্যোগও অভিজ্ঞতা থেকে শেখার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হতে পারে।
ক্রীড়াকে অর্থনীতির নতুন খাতে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা:
এবারের বাজেটে এমন কিছু উদ্যোগও রয়েছে, যা শুধু বিদ্যমান সমস্যার সমাধান নয়; বরং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অনুসন্ধানের দিকেও ইঙ্গিত করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ক্রীড়া অর্থনীতি এবং সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার একটি নতুন প্রশ্ন সামনে আনছে। যেসব কার্যক্রম এত দিন মূলত সংস্কৃতি, বিনোদন কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, সেগুলো কি ভবিষ্যতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে?
বাংলাদেশের জন্য এটি এখনো অনেকটাই নতুন ও অনাবিষ্কৃত একটি ক্ষেত্র। তাই এখানে নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই। রয়েছে সম্ভাবনা এবং সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা। অর্থনীতির ভাষায় এ ধরনের উদ্যোগকে অনেক সময় নতুন সুযোগ আবিষ্কারের প্রক্রিয়া বা ডিসকভারি প্রসেস বলা হয়, যেখানে বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথ উন্মোচিত হয়।
শেখার মধ্যেই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য:
এবারের বাজেট নিয়ে আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ব্যয়ের পরিমাণ এবং সেই ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা। কিন্তু বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কয়েকটি নতুনধারার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। একসময় বাজেট মানেই ছিল সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা। সেগুলোর গুরুত্ব এখনো অপরিসীম। তবে এবারের বাজেটের কিছু উদ্যোগ ভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয়। এগুলো ইট-পাথরের নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নীতিগত কাঠামোকে আরও কার্যকর করার প্রচেষ্টা।
ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাবিজ ও ডিজিটাল বিনিয়ন্ত্রণকরণের উদ্যোগ ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশকে আরও সহজ ও আধুনিক করতে চায়। অন্যদিকে মৎস্য বিমা, নীল অর্থনীতি এবং ক্রীড়া অর্থনীতি–সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলো ভবিষ্যতের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথ খুঁজছে।
এসব উদ্যোগের সফলতা শুধু পরিকল্পনা কতটা নিখুঁতভাবে তৈরি হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সক্ষমতা। একটি কর্মসূচি ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ করল কি না, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, সরকার এসব উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করবে কি না, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবে কি না এবং প্রয়োজন হলে নীতিতে পরিবর্তন আনবে কি না।
কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য ফলাফল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা, বিভিন্ন অংশীজনের মতামত সংগ্রহ করা, ব্যর্থতার কারণ স্বীকার করা এবং সফল উদ্যোগগুলোকে আরও বিস্তৃত করার মানসিকতা অপরিহার্য। কারণ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথম প্রচেষ্টাতেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। অনেক সময় ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা, ভুল থেকে শিক্ষা এবং সময়োপযোগী পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই কার্যকর সমাধান গড়ে ওঠে। অনেকে এবারের বাজেটকে ‘আকাঙ্ক্ষাভিত্তিক বাজেট’ বলে উল্লেখ করছেন। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, এটি শেষ পর্যন্ত ‘শিক্ষাভিত্তিক বাজেট’-এ পরিণত হবে কি না।
এই বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর কয়েকটি নতুন উদ্যোগ, যেগুলোকে শুধু নতুন কর্মসূচি হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি ধরা পড়ে না। এগুলো মূলত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু সাহসী ধারণা এবং নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা। এমন অনেক ক্ষেত্রে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে, যেখানে আগে থেকে কোনো নির্ভুল বা পরীক্ষিত নকশা নেই।
ফলে বহু প্রশ্নের উত্তর বাস্তবায়নের পথেই খুঁজে নিতে হবে। অভিজ্ঞতা, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং সেখান থেকে অর্জিত শিক্ষাই নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগগুলোর ভবিষ্যৎ। শেষ পর্যন্ত সময়ই জানাবে, এই বাজেট কেবল পরিকল্পনা ও ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আরও কার্যকর নীতি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছিল।
- সৈয়দ আখতার মাহমুদ: বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা

