বাংলাদেশের শিল্প খাত এক কঠিন সময় পার করছে। গত দুই বছরে দেশের পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে শুধু উৎপাদনই কমে যায়নি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিল্প উদ্যোক্তা, শ্রমিক নেতা এবং অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে সামনে আরও বড় সংকট অপেক্ষা করছে।
শিল্প পুলিশ ও বিভিন্ন উদ্যোক্তা সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক কারখানা উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করেছে। সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট। প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়েছে, আবার অনেকেই শেষ পর্যন্ত কার্যক্রমই বন্ধ করে দিয়েছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন শ্রমিকরা। শ্রমিক নেতাদের দাবি, শুধু তৈরি পোশাক শিল্পেই গত দুই বছরে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অন্যান্য শিল্প খাতের হিসাব যুক্ত করলে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। চাকরি হারানো হাজারো পরিবার এখন আয়-অনিশ্চয়তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
শিল্প খাতের এই দুরবস্থার প্রভাব দেশের রপ্তানি আয়েও পড়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় পণ্য রপ্তানি প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের নতুন ক্রয়াদেশও আগের তুলনায় কম এসেছে। ফলে শিল্প উৎপাদনের গতি আরও মন্থর হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শিল্প খাতের দুর্বল অবস্থারই প্রতিফলন।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এত বিপুল সংখ্যক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, শিল্পে বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানও সংকুচিত হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ তৈরি হবে।
তিনি মনে করেন, সরকার যে প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে, তা কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে অনেক কারখানা এমন অবস্থায় পৌঁছে গেছে, যেখানে শুধু ঋণ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠান আর পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়, তাদের জন্য আলাদা প্রস্থান নীতি গ্রহণেরও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে যেসব কারখানা এখনও টিকে থাকার সম্ভাবনা রাখে, সেগুলোর জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ এবং পরিচালন মূলধনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার চাপ কমাতে শিল্পাঞ্চলে স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিক্রির কর্মসূচি সম্প্রসারণেরও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে মোট ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পের এবং ২৮৭টি অন্যান্য খাতের। তবে উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই বছরে তাদের সদস্যভুক্ত ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ১৪১টি কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ২০২৪ সালে বন্ধ হয়েছিল আরও ৭৭টি কারখানা।
অন্যদিকে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত তাদের সদস্যভুক্ত ২৩৪টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ১১৪টি সুতা উৎপাদনকারী কারখানা। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো কাপড় তৈরি, রং করা, ছাপানো ও সমাপ্তকরণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, শুধু বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানই নয়, বর্তমানে আরও শত শত কারখানা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেক কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রায় ১ হাজার ৩২১টি কারখানা বর্তমানে আংশিকভাবে উৎপাদন করছে। একইভাবে বিটিএমএর সদস্যভুক্ত ১ হাজার ১২১টি কারখানাও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট শিল্পাঞ্চলগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বহু কারখানা প্রতিদিন লোডশেডিং এবং গ্যাসের চাপ কম থাকার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ করছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়। কিন্তু ডিজেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্য উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নতুন গ্যাস সংযোগ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় অনেক নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও উৎপাদনে যেতে পারছে না। বিশেষ করে স্টিল রি-রোলিং মিল এবং সিরামিক শিল্পে এই সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
আশুলিয়ার একটি সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খোরশেদ আলম জানান, তাঁদের কারখানায় গ্যাসের চাপ থাকার কথা ১০ পিএসআইজি হলেও অধিকাংশ সময় তা ১ থেকে ২ পিএসআইজির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিল্প খাতের ওপর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও প্রভাব পড়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন দেশের শুল্কনীতি এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা শিল্প খাতের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশও আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।
রপ্তানি আদেশের চিত্রেও সেই সংকট স্পষ্ট। পোশাক শিল্পে কাঁচামাল আমদানির অনুমোদনসংক্রান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক মাসে নতুন রপ্তানি আদেশের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে জুন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আদেশের অর্থমূল্যে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে শিল্পে বর্তমান সংকট আরও গভীর হতে পারে। এর প্রভাব কেবল শিল্প মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করবে।

