দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর উৎপাদনে গিয়ে প্রথম বছরেই বড় সাফল্যের দেখা পেয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা। উৎপাদন শুরুর মাত্র এক বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি ২৩২ দশমিক ৬৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে এটিই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা লাভের মুখ দেখেছে।
নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় সরকারি মালিকানায় গড়ে ওঠা এই আধুনিক কারখানাটি ২০২৩ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলেও উৎপাদন শুরু হয় প্রায় আট মাস পর, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন আসে।
সম্প্রতি প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, উৎপাদন শুরুর আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে কারখানাটি ৩৩৭ দশমিক ৮২ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়ে। তখন উৎপাদন না থাকলেও ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ বহন করতে হয়েছিল। কিন্তু উৎপাদন শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায় এবং প্রথম বছরেই প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থানে পৌঁছে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ খানের মতে, এই সাফল্যের মূল কারণ ছিল নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ। তিনি জানান, পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়ায় কারখানাটি পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। ফলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি প্রথম বছরেই উল্লেখযোগ্য মুনাফা এসেছে।
দেশের কৃষি খাতে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। প্রায় ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত এই কারখানাটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিদিন এখানে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন এবং বছরে প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এই সক্ষমতা দেশের সার উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কারখানাটির মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ২ হাজার ৬৩২ দশমিক ২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশের বাজারে সার বিক্রি থেকে এসেছে ১ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা এবং সরকারি ভর্তুকি থেকে এসেছে ৮৯৯ কোটি টাকা।
সব ধরনের আয় বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটির মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৯০১ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয় বাবদ ১৭০ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা বাদ দেওয়ার পর পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা। এছাড়া স্থায়ী আমানত এবং অন্যান্য বিনিয়োগের সুদ থেকে আরও প্রায় ৩০ কোটি টাকা আয় হয়েছে। অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকে প্রায় ২৫১ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত ছিল।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি বড় আর্থিক দায়ও বহন করতে হয়েছে কোম্পানিটিকে। এক বছরে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি দায়ের পরিমাণ ১২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণ রয়েছে ১০ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় নেওয়া ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যাংকের কাছে কোম্পানির ঋণের স্থিতি ছিল ৭ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। পাশাপাশি বহুপাক্ষিক বিনিয়োগ গ্যারান্টি সংস্থার সহায়তায় নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এই দুই বিদেশি ঋণদাতাকে প্রায় ১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি লাভ করবে বলে তারা আশাবাদী। তবে গত বছরের তুলনায় মুনাফা কিছুটা কম হতে পারে। কারণ গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৪০ দিন কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর ফলে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯০ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বিদেশি ঋণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলেও উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় দিয়েই সেই ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে। ১০ বছর মেয়াদি ঋণের ইতোমধ্যে ছয়টি কিস্তি পরিশোধও সম্পন্ন হয়েছে। ভবিষ্যতেও যদি পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আরও বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিবেদনে ভিন্ন একটি চিত্রও উঠে এসেছে। একই অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাকি চারটি ইউরিয়া সার কারখানা সম্মিলিতভাবে ৪১৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১৫ দশমিক ১৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে আশুগঞ্জ সার ও রাসায়নিক কারখানার। এছাড়া শাহজালাল সার কোম্পানির লোকসান ১৩৪ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার ৩৩ কোটি টাকা এবং যমুনা সার কারখানার ৩০ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পার্থক্যের সবচেয়ে বড় কারণ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ। যেসব কারখানায় প্রয়োজনীয় চাপ ও পরিমাণে গ্যাস পাওয়া যায়নি, সেগুলো উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং লোকসান বেড়েছে। বিপরীতে ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পেরেছে এবং লাভ করেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানাগুলো মিলিয়ে ১১ লাখ ২৮ হাজার টন ইউরিয়া, ৭২ হাজার টন ট্রিপল সুপার ফসফেট এবং ৪৯ হাজার ৫৩২ টন ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট উৎপাদিত হয়েছে। তবে দেশের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন যথেষ্ট না হওয়ায় একই সময়ে বাংলাদেশকে আরও ১৬ লাখ ৪৪ হাজার টন ইউরিয়া আমদানি করতে হয়েছে।
এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, শুধু নতুন কারখানা নির্মাণই যথেষ্ট নয়; উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানার প্রথম বছরের সাফল্য প্রমাণ করেছে, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা থাকলে রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানও লাভজনক হতে পারে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং দেশের সার উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখা।

