২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের আয়কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ৫ শতাংশ করহার তুলে দিয়ে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে পুরো করস্ল্যাব।
এই পরিবর্তনের ফলে অনেকের করের পরিমাণ আগের মতোই থাকবে, আবার যাদের আয় তুলনামূলক বেশি, তাদের করের বোঝা বাড়বে। তাই নতুন নিয়ম অনুযায়ী নিজের আয়কর কীভাবে হিসাব করবেন, তা আগে থেকেই জানা জরুরি।
করমুক্ত আয়সীমা কত?
নতুন অর্থবছরে সাধারণ করদাতাদের জন্য বছরে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত।
নারী করদাতা ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিকদের করমুক্ত আয়সীমা করা হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের জন্য এই সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
আর গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
তবে মনে রাখতে হবে, যাদের আয় করযোগ্য সীমা অতিক্রম করবে, তাদের ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা আয়কর দিতে হবে।
নতুন করস্ল্যাব কীভাবে সাজানো হয়েছে?
সাধারণ করদাতাদের ক্ষেত্রে প্রথম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো কর দিতে হবে না।
এরপরের ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ কর প্রযোজ্য হবে।
তারপরের ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
এরপরের ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ কর ধার্য করা হয়েছে।
পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
আর এর বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
সরকার একদিকে করমুক্ত সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে ৫ শতাংশ করস্ল্যাব বাতিল করেছে। ফলে বিভিন্ন আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাবও ভিন্ন হয়েছে।
যাদের করের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকবে
বার্ষিক ৬ লাখ টাকা আয় হলে আগের মতো এখনও ২০ হাজার টাকা কর দিতে হবে।
একইভাবে বছরে ৭ লাখ টাকা আয় হলেও কর থাকবে ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এই দুই স্তরের করদাতাদের ক্ষেত্রে নতুন নিয়মে অতিরিক্ত করের চাপ পড়ছে না।
মাসিক আয় অনুযায়ী করের হিসাব
যদি আপনার মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা হয়, তাহলে বছরে আয় দাঁড়াবে ৪ লাখ টাকা। এই আয় পুরোপুরি করমুক্ত। অর্থাৎ কোনো আয়কর দিতে হবে না।
মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় হলে বছরে মোট আয় হবে ৬ লাখ টাকা। এই আয়ের জন্য আগের মতোই ২০ হাজার টাকা কর দিতে হবে।
মাসে প্রায় ৫৮ হাজার ৩৩৩ টাকা আয় করলে বছরে আয় হবে ৭ লাখ টাকা। এই ক্ষেত্রেও কর অপরিবর্তিত থেকে ৩০ হাজার টাকা থাকবে।
মাসে ৬২ হাজার ৫০০ টাকা আয় করলে বছরে মোট আয় হবে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আগে এই আয়ের জন্য কর দিতে হতো ৩৫ হাজার টাকা। এখন দিতে হবে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত ২ হাজার ৫০০ টাকা।
মাসে প্রায় ৮৩ হাজার ৩৩৩ টাকা আয় করলে বছরে আয় হবে ১০ লাখ টাকা। আগে কর ছিল ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। নতুন নিয়মে দিতে হবে ৭৫ হাজার টাকা। ফলে কর বাড়ছে ৭ হাজার ৫০০ টাকা।
মাসে ১ লাখ টাকা আয় হলে বছরে মোট আয় দাঁড়াবে ১২ লাখ টাকা। আগে কর ছিল ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা। এখন দিতে হবে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
মাসিক আয় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা হলে বছরে আয় হবে ১৫ লাখ টাকা। আগে কর দিতে হতো ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এখন দিতে হবে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ কর বাড়ছে ২০ হাজার টাকা।
মাসে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় হলে বছরে আয় দাঁড়াবে ১৮ লাখ টাকা। আগে কর ছিল ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। নতুন নিয়মে কর হবে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত ৩০ হাজার টাকা।
মাসে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা আয় হলে বছরে আয় ২০ লাখ টাকার বেশি হবে। আগে এই আয়ের জন্য কর ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা। এখন দিতে হবে ২ লাখ ৯১ হাজার টাকা। অর্থাৎ কর বাড়বে ৩২ হাজার ৫০০ টাকা।
কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন কর কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিম্ন ও সীমিত আয়ের করদাতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের বার্ষিক আয় ৪ লাখ টাকার মধ্যে, তারা পুরোপুরি করমুক্ত থাকবেন। এতে নতুন করদাতাদের ওপর চাপ কমবে।
তবে মধ্যম ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। ৫ শতাংশ করস্ল্যাব তুলে দেওয়ায় ৬ লাখ ও ৭ লাখ টাকা আয়ের মানুষের কর অপরিবর্তিত থাকলেও, এর ওপরে আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করের পরিমাণও দ্রুত বাড়তে শুরু করবে। ফলে বেশি আয়ের ব্যক্তিদের আগের তুলনায় বেশি কর পরিশোধ করতে হবে।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, এখানে শুধু করযোগ্য আয়ের ভিত্তিতে হিসাব দেখানো হয়েছে। যদি কোনো করদাতা বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত বা অন্যান্য আইনসম্মত সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে তার প্রকৃত করের পরিমাণ এই হিসাবের চেয়ে কম হতে পারে।
নতুন আয়কর কাঠামোর মূল লক্ষ্য একদিকে নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বস্তি দেওয়া, অন্যদিকে তুলনামূলক বেশি আয়ের করদাতাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো। তাই নিজের আয় কোন স্তরে পড়ছে এবং নতুন নিয়ম অনুযায়ী কত কর দিতে হবে, তা আগেই বুঝে রাখা হলে কর রিটার্ন দাখিলের সময় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।

