বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত এক বছরে সবচেয়ে ইতিবাচক খবরগুলোর একটি এসেছে প্রবাসী আয়ের খাত থেকে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থের ধারাবাহিক প্রবাহ শুধু দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেনি, একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের চাপ কাটিয়ে রিজার্ভকেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সেই ইতিবাচক ধারার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পষ্টভাবে দেখা গেল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দিন শেষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত বিপিএম-৬ হিসাবপদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন ডলার। এর আগের দিন, অর্থাৎ ৩০ জুন, এই রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। ফলে প্রথমবারের মতো এই পদ্ধতিতে দেশের রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, মোট বা গ্রস রিজার্ভও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে এর পরিমাণ ৩৭ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় চার বছর পর আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছাড়িয়েছে। এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর এত বড় রিজার্ভ আর দেখা যায়নি। চলতি বছরের ২৯ জুন প্রথমবারের মতো গ্রস রিজার্ভ আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে।
এই রিজার্ভ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে পাঠিয়েছেন ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।
এটি আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগের অর্থবছরেও রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৬৪২ কোটি ডলার। অর্থাৎ টানা দুই বছর ধরে প্রবাসী আয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রণোদনা এবং হুন্ডির পরিবর্তে আনুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর আগ্রহ বাড়ায় রেমিট্যান্সে এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এসেছে।
অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রেমিট্যান্সে সামান্য কমতি দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্র ছিল ইতিবাচক। ঈদের পরের মাস হওয়ায় ওই সময়ে দেশে এসেছে ২৮১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। আগের বছরের একই মাসে এই পরিমাণ ছিল ২৮২ কোটি ২৫ লাখ ডলার।
তবে জুনের এই সামান্য হ্রাস পুরো অর্থবছরের সাফল্যকে প্রভাবিত করতে পারেনি। কারণ এর আগে টানা ছয় মাস প্রবাসীরা প্রতি মাসেই ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল এক ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের চাপের মধ্যে ছিল। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের সংকট, অর্থ পাচারসহ নানা কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে ২০২৪ সালের আগস্টে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময়, গ্রস রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী ২০২৩ সালের জুন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ প্রকাশ শুরু করে। সে সময় এই হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। পরে তা আরও কমে ২০২৪ সালের আগস্টে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়।
তবে পরিস্থিতি এরপর ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবাহের ফলে ১৯ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। এরপর ১৪ জুন তা ৩১ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছাড়ায় এবং এখন ৩৩ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে নতুন মাইলফলক গড়েছে।

