বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আশাবাদ রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে এই খাত এখনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে রয়েছে জ্বালানি, খনিজ, খাদ্য, ওষুধ এবং শিল্পকারখানার কাঁচামালের মতো মূল্যবান সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের জৈবপ্রযুক্তিনির্ভর নানা পণ্য উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার ২০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেছে। এ অর্থ সামুদ্রিক গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা হবে।
দেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত গবেষণায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন, সম্ভাব্য মৎস্য আহরণ এলাকা নির্ধারণ, সমুদ্রতলের খনিজসম্পদ অনুসন্ধান, সামুদ্রিক শৈবাল, জেলিফিশ, সি আর্চিন, ফাইটোপ্লাঙ্কটন এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে লবণ উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সম্পদ পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বাজেটে ব্লু ইকোনমিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি:
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বাংলাদেশের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে ব্লু ইকোনমিকে অন্যতম প্রধান ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে গভীর সমুদ্রের মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং টেকসই সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনায় তথ্যপ্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি ব্লু ইকোনমিকে ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কেমিক্যাল ওশানোগ্রাফি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মো. হাসিবুল ইসলাম বলেন, দেশের সুনীল অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। তার মতে, গবেষণার মাধ্যমে চিহ্নিত সামুদ্রিক সম্পদ এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে তা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। জ্বালানি উৎপাদন, সমুদ্রতলের খনিজসম্পদ, সামুদ্রিক শৈবাল, জেলিফিশ ও সি আর্চিনসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক সম্পদ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করতে সক্ষম।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল বাংলাদেশের প্রবালপ্রাচীর কেবল সেন্টমার্টিনেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ২০২৩ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পরিচালিত সমুদ্র অভিযানে ১১টি স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে সেন্টমার্টিনের বাইরে আরও তিনটি নতুন প্রবালসমৃদ্ধ এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। প্রায় ৫৪ বছর পর দেশের অন্য সমুদ্রাঞ্চলেও প্রবালের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে।
ড. হাসিবুল ইসলামের মতে, নতুন আবিষ্কৃত প্রবাল অঞ্চলগুলো সামুদ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি প্রবাল, শৈবাল, জেলিফিশ ও সি আর্চিন থেকে নতুন ওষুধ, বায়োমেটেরিয়াল, মূল্যবান রাসায়নিক উপাদান এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য উৎপাদনের সুযোগও তৈরি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গবেষণায় পাওয়া তথ্য ও সম্পদ পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে ব্লু ইকোনমি আরও সমৃদ্ধ হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
অন্যদিকে, ফিজিক্যাল অ্যান্ড স্পেস ওশানোগ্রাফি বিভাগের গবেষণায় দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় সমুদ্রের ঢেউ ও জোয়ারভাটার শক্তির সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন এবং বিশেষ করে পটুয়ারটেক উপকূলীয় এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরঙ্গশক্তি ও জোয়ারভাটাজনিত শক্তি রয়েছে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এসব শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হলে তা দেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বয়ে আনবে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন পথ খুলে দেবে।
সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ নিয়েও গবেষণায় আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে জেলেরা মাছের অবস্থান নির্ধারণে মূলত অভিজ্ঞতা ও অনুমানের ওপর নির্ভর করে আসছেন। তবে উত্তর বঙ্গোপসাগরে পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় সম্ভাব্য মৎস্য আহরণ অঞ্চল শনাক্ত করার নতুন উপায় পাওয়া গেছে। গবেষকরা সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, ক্লোরোফিলের মাত্রা এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক ভৌত প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য মৎস্য আহরণ অঞ্চল সফলভাবে নির্ধারণ করেছেন।
গবেষণায় মিলছে সমুদ্রসম্পদের নতুন সম্ভাবনা:
গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চল এবং আপওয়েলিংয়ের প্রভাবে সমুদ্রের যেসব এলাকায় গভীরের ঠান্ডা, ঘন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি ওপরে উঠে আসে, সেখানে পুষ্টি উপাদানের মাত্রা বেশি থাকায় মাছের উপস্থিতিও তুলনামূলক বেশি। গবেষণায় ব্যবহৃত ক্রোকো-পাইসিস মডেলের মাধ্যমে সমুদ্রের ঢেউ, স্রোত, তাপমাত্রাসহ ভৌত পরিবর্তনের পাশাপাশি অক্সিজেন, কার্বন ও পুষ্টি উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এ পদ্ধতিতে তাপীয় ফ্রন্ট, আপওয়েলিং অঞ্চল এবং একম্যান পাম্পিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রক্রিয়াও সফলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মাছের অবস্থান আগাম নির্ধারণ করা গেলে জেলেদের সমুদ্রে অপ্রয়োজনীয় সময় ও জ্বালানি ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে মাছ আহরণের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাও বাড়বে।
সমুদ্রসীমার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় খনিজসম্পদের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেলেও সাম্প্রতিক গবেষণা নতুন আশার বার্তা দিয়েছে। জিওলজিক্যাল ওশানোগ্রাফি বিভাগের গবেষণায় ভোলা থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন স্থানে ভারী খনিজের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় এসব খনিজের গড় ঘনত্ব ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো স্থানে এর পরিমাণ ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। গবেষকদের মতে, এই তথ্য ভবিষ্যতের খনিজ অনুসন্ধান কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে তেঁতুলিয়া নদীর মোহনা এবং দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র এলাকা সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
উপকূলে ভেসে আসা সামুদ্রিক শৈবালকে অনেকেই অপ্রয়োজনীয় মনে করলেও গবেষণা বলছে, এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে মূল্যবান জৈব উপাদান। দেশে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি সামুদ্রিক শৈবাল নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় বিভিন্ন প্রজাতিতে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনলিক যৌগ এবং অন্যান্য জৈব সক্রিয় উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সারগ্যাসাম শৈবালে ভিটামিন ‘এ’ উৎপাদনে সহায়ক বেটা-ক্যারোটিন ও ফ্ল্যাভোনয়েডের পরিমাণ বেশি। হাইড্রোপুনটিয়া শৈবালে প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কার্যকর ফেনলিক যৌগের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে হাইপনিয়া কর্নুটা শৈবালে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়ক হতে পারে। গবেষকদের মতে, এসব উপাদান খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী এবং পুষ্টিপণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতে শৈবালভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে নতুন রপ্তানি খাতেরও সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
কক্সবাজার ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে জেলিফিশের আধিক্য এতদিন পর্যটন ও মৎস্য খাতের জন্য সমস্যা হিসেবেই বিবেচিত হতো। তবে গবেষণায় এই প্রাণীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিকটিও সামনে এসেছে। গবেষকরা ১৫টি জেলিফিশ প্রজাতির উপস্থিতি নথিভুক্ত করেছেন। এর মধ্যে দুটি প্রজাতির রাসায়নিক বিশ্লেষণে উচ্চমাত্রার প্রোটিন এবং কম চর্বির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি এসব জেলিফিশ থেকে খাদ্য ও বায়োমেডিকেল শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী কোলাজেন সংগ্রহের সম্ভাবনাও নিশ্চিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কোলাজেনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তাই জেলিফিশকে কেন্দ্র করে শিল্প গড়ে তোলা গেলে এটি দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সি আর্চিন নিয়েও গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল মিলেছে। গবেষকদের ভাষ্য, এ প্রাণী থেকে প্রাপ্ত কিছু জৈব উপাদান চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় সি আর্চিনের নির্যাস মানুষের সার্ভাইক্যাল ক্যানসার কোষ এবং কয়েক ধরনের ক্ষতিকর অণুজীবের ওপর পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, কিছু নির্যাস ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ধীর করতে বা দমন করতে সক্ষম হতে পারে। একই সঙ্গে সালমোনেলা প্যারাটাইফি ব্যাকটেরিয়া এবং অ্যাসপারজিলাস নাইজার ছত্রাকের বিরুদ্ধেও এ নির্যাস কার্যকর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, এসব গবেষণার ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখায় যে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব শুধু পরিবেশ সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বায়োঅ্যাকটিভ ওষুধ শিল্পেও এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এসব সামুদ্রিক উপাদান কাজে লাগিয়ে নতুন ওষুধ এবং জৈবপ্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কক্সবাজার উপকূলের ফাইটোপ্লাঙ্কটন নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় মোট ৫৩টি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি প্রজাতিকে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্ষুদ্র এই সামুদ্রিক অণুজীবগুলো সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বহন করে। বিশেষ করে সাইক্লোটেলা, থ্যালাসিওসিরা, চেটোসেরোস, স্কেলেটোনেমা এবং নিতজশিয়া প্রজাতিগুলোতে এমন জৈব বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যতে জৈব জ্বালানি উৎপাদন, জলজ চাষ এবং ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বায়োলজিক্যাল ওশানোগ্রাফি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার আবু সাইদ মুহাম্মদ শরীফ বলেন, সামুদ্রিক শৈবাল, জেলিফিশ, সি আর্চিন এবং ফাইটোপ্লাঙ্কটন নিয়ে পরিচালিত গবেষণাগুলো শুরু থেকেই ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে পরিচালনা করা হয়েছে। গবেষণার প্রতিটি ধাপে এসব সম্পদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবহারযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, সি আর্চিন নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় এর ঔষধি গুণাগুণ, বিষাক্ততার মাত্রা এবং ক্যানসার চিকিৎসায় সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণত ক্ষতিকর হিসেবে পরিচিত জেলিফিশকে কীভাবে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা যায়, সেই সম্ভাবনাও গবেষণার আওতায় আনা হয়েছে।
আবু সাইদ মুহাম্মদ শরীফ আরও বলেন, গবেষণায় জেলিফিশের তিনটি ভক্ষণযোগ্য প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। এসব প্রজাতি প্রক্রিয়াজাত করে কোলাজেন উৎপাদন করা সম্ভব, যা স্বাস্থ্যসেবা পণ্য, হারবাল ওষুধ এবং বায়োমেটেরিয়াল শিল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। তার মতে, এ ধরনের প্রতিটি গবেষণাই দেশের সুনীল অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম।
এদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচলিত পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিত বাষ্পীভবনভিত্তিক শিল্প পদ্ধতি ব্যবহার করলে একই মৌসুমে প্রায় চার গুণ বেশি লবণ উৎপাদন সম্ভব। শুধু উৎপাদনই নয়, এতে লবণের মানও উন্নত হয় এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ প্রায় ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা যায়।
গবেষকদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের লবণ শিল্প আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং লাভজনক খাতে পরিণত হতে পারে।

