বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত আকার ও কাঠামো আরও সঠিকভাবে তুলে ধরতে নতুন করে মোট দেশজ উৎপাদন পরিমাপ বা ভিত্তি বছর পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।
এ উদ্যোগে দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়া নতুন খাত, পরিবর্তিত উৎপাদন কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে একসঙ্গে বিবেচনায় আনা হচ্ছে। লক্ষ্য হলো জাতীয় হিসাবকে আরও বাস্তবসম্মত ও আধুনিক করা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ভিত্তি বছর ধরা হচ্ছে ২০২৫-২৬ অর্থবছর। এটি পুরোনো ২০১৫-১৬ ভিত্তি বছরের পরিবর্তে ব্যবহার করা হবে।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট, আবাসন এবং অনাবাসিক ভবন খাতে মাঠপর্যায়ে জরিপ চলছে। পরিসংখ্যান সংস্থাটিকে নতুন জাতীয় হিসাব প্রস্তুত করতে ২০টিরও বেশি অতিরিক্ত জরিপ সম্পন্ন করতে হবে।
নতুন হিসাব কবে প্রকাশ করা হবে তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। কারণ পুরো দেশের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ শেষ করতে সময় লাগবে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর আরেক কর্মকর্তা বলেন, পুরো কাজ শেষ করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। আর এর প্রভাব ২০২৮-২৯ অর্থবছরে দেখা যেতে পারে।
কেন এই পুনর্গণনা:
অর্থনীতিতে উৎপাদন ধারা, ভোক্তার আচরণ এবং নতুন শিল্প খাতের উত্থান নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। তাই প্রতি প্রায় দশ বছর পর পর এই ধরনের পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। এতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের গুরুত্ব বা অংশীদারিত্ব নতুন করে নির্ধারণ করা হয়। আগে কম ধরা পড়া বা বাদ পড়া খাতও এতে যুক্ত হয়।
এই পুরো কাজটি করা হচ্ছে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা এবং ইউরোপীয় কমিশনের যৌথভাবে তৈরি নতুন জাতীয় হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী। এই কাঠামোতে ডিজিটাল অর্থনীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য সংযোগ, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, টেকসই উন্নয়ন এবং ইসলামী অর্থনীতির হিসাবও অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত এক দশকে বাংলাদেশে বড় পরিবর্তন এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল বাণিজ্য, লজিস্টিকস, আর্থিক প্রযুক্তি, আধুনিক খুচরা বাজার এবং নতুন কৃষিপণ্যের প্রসার দ্রুত বেড়েছে। ড্রাগন ফল ও স্ট্রবেরি চাষের মতো উচ্চমূল্যের কৃষি খাতও এখন অর্থনীতিতে নতুন অবদান রাখছে। সরকারও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে শীতল পাটির মতো ঐতিহ্যবাহী পণ্যের প্রসারকে দেখা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর জাতীয় আয় বা মোট জাতীয় আয় দাঁড়াতে পারে ৫২৯ বিলিয়ন ডলারে। নতুন ভিত্তি বছর নির্ধারণের পর এই আকার ও কাঠামো আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
এই পুনর্গণনার ফলে শুধু মোট দেশজ উৎপাদন নয়, আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূচকেও পরিবর্তন আসবে। কর-জিডিপি অনুপাত, সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত, বাজেট ঘাটতি-জিডিপি এবং বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত নতুন হিসাব অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এতে বাস্তব অর্থনৈতিক কার্যক্রম বদলাবে না। শুধু পরিমাপ আরও সঠিক হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনানুষ্ঠানিক খাত দীর্ঘদিন ধরে সঠিকভাবে পরিমাপ করা কঠিন ছিল। নতুন জরিপ ও পদ্ধতির মাধ্যমে এই খাতের অবদান আরও ভালোভাবে ধরা পড়বে। এতে নীতিনির্ধারকদের জন্য অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র বোঝা সহজ হবে।
এই পুরো কাজটি পরিচালিত হচ্ছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পরিসংখ্যান ব্যুরো, যেখানে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তা রয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে একটি আধুনিক ডিজিটাল পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে ব্যবসা, পরিবার, কৃষি ও মূল্যসূচক সম্পর্কিত তথ্য আরও উন্নতভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পুনর্গণনা সফল হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। বিদেশি ঋণদাতা, বিনিয়োগকারী ও ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে। একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, এর ফলে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হবে এবং নীতি নির্ধারণে সরকার আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
নারীরা গৃহস্থালি কাজে পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করেন। এই অনাদায়ী শ্রম অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও এটি সরাসরি মোট দেশজ উৎপাদনে ধরা পড়ে না। নতুন পদ্ধতিতে এই ধরনের অবদান আলাদা স্যাটেলাইট হিসাবের মাধ্যমে দেখানো হবে।

