মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির খবর নেই। কারণ গত সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি মজুরি। ফলে আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন সীমিত আয়ের শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কোনো মাসেই জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে অতিক্রম করতে পারেনি। অর্থাৎ টানা ৫৩ মাস ধরে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে।
বিবিএসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে। মে মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ ছিল। তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকেই যাচ্ছে।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, আর জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। সেটিই ছিল শেষ মাস, যখন মজুরি মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
এরপর থেকে প্রতিটি মাসেই মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি থেকেছে। সর্বশেষ জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, অথচ জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর অর্থ, মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ বাড়লেও সেই টাকা দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনানুষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত হয়। পাঁচ কোটির বেশি মানুষ এই খাতে কাজ করেন। তাদের বড় অংশের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ে না। ফলে বাজারদর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
চলতি জুলাই মাস থেকে নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী মূল বেতন পেতে শুরু করবেন। অর্থনীতিবিদদের একাংশের আশঙ্কা, এর ফলে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি হলে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বাসাভাড়া ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বেসরকারি চাকরিজীবী ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং ব্যয় করার সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। তার মতে, অনেক পরিবার এখন সংসারের খরচ সামলাতে বিনোদন, ভ্রমণ ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবাখাতেও।
রাজধানীর কাওলা এলাকায় বসবাসকারী বেসরকারি চাকরিজীবী জাকির হোসেন জানান, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তার বেতন বাড়েনি। ২০২৬ সালে বেতন পাঁচ হাজার টাকা বাড়লেও বাজারের ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে না।
তার ভাষ্য, গত তিন বছরে কয়েক দফা বাসাভাড়া বেড়েছে, নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। আগে প্রতি মাসে কিছু টাকা সঞ্চয় করা গেলেও এখন মাস শেষে প্রায়ই অর্থসংকটে পড়তে হয়। অনেক সময় ধার করে সংসার চালাতে হয়। জাকির হোসেনের অভিজ্ঞতা এখন দেশের অসংখ্য সীমিত আয়ের ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তব চিত্র।
২০২১ সাল পর্যন্ত দেশে মূল্যস্ফীতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। এর প্রভাব পড়ে দেশীয় বাজারেও।
একই বছরের আগস্টে দেশে জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়। এরপর মূল্যস্ফীতি দ্রুত সাড়ে ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়। একই সময়ে ডলারের দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে নিত্যপণ্যের মূল্য আরও বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, সে সময় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছায় এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশেরও বেশি হয়, যা আগের ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। পরবর্তীতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এলেও সাম্প্রতিক তিন মাস ধরে তা আবার ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম তিনটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রথমত, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও মজুরি ও বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে আয়-বৈষম্য না বাড়ে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রেখে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সেগুলো পৌঁছে দিতে হবে। তৃতীয়ত, বাজারে কৃত্রিম সংকট, সিন্ডিকেট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে শুধু পরিসংখ্যানে উন্নতি দেখিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

