২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও রপ্তানিতে প্রতিযোগী এবং সমজাতীয় অর্থনীতির বহু দেশের তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। এমনকি আফ্রিকার কয়েকটি দেশও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। গত বছর দেশে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ দুই বিলিয়ন ডলারেরও নিচে ছিল।
মঙ্গলবার প্রকাশিত জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড)-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’-এ বাংলাদেশসহ প্রায় ২০০টি দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির অনিশ্চয়তা এখনও বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ প্রবাহকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে।
আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে নিট এফডিআই এসেছে ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালের তুলনায় যা ৪৪ শতাংশ বেশি। এর আগের বছর দেশে এফডিআই এসেছিল ১২৩ কোটি ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৮ শতাংশ কম ছিল।
একই সময়ে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের মোট স্থিতি (এফডিআই স্টক) বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৬৩ কোটি ডলারে। ২০২৪ সালের শেষে এই পরিমাণ ছিল এক হাজার ৭৮৬ কোটি ডলার। নিট এফডিআই বলতে নির্দিষ্ট সময়ে দেশে আসা মোট বিদেশি বিনিয়োগ থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুঁজি প্রত্যাহারের অর্থ বাদ দেওয়ার পর যে পরিমাণ থাকে, সেটিকেই বোঝানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মধ্যে মোট এফডিআই প্রবাহ ২১ শতাংশ বেড়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ এলডিসির এমন কয়েকটি দেশের মধ্যে রয়েছে, যেখানে নতুন প্রকল্পভিত্তিক বা গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ এসেছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক একটি চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ যাচাইয়ের একটি বিনিয়োগ স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়েও সম্মত হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগের এই প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও দীর্ঘমেয়াদি চিত্র নিয়ে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ ও পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ। তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে আসা এফডিআইয়ের বড় অংশই আন্তঃকোম্পানি ঋণ এবং আগে বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে এসেছে। একেবারে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও তুলনামূলক কম। ফলে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর নীতি ও উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতির আকার ও সম্ভাবনার তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ এখনও খুবই সীমিত। বছরে যে পরিমাণ এফডিআই আসে, তা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আধা শতাংশেরও কম। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এজন্য জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিনিয়োগ কৌশলও পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।
প্রতিযোগী দেশগুলো কোথায়:
আঙ্কটাডের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের তুলনায় রপ্তানিতে প্রতিযোগী দেশগুলো অনেক বেশি বিদেশি বিনিয়োগ টানতে সক্ষম হয়েছে।
- ভিয়েতনাম ২০২৫ সালে ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি এফডিআই পেয়েছে।
- কম্বোডিয়ায় এসেছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার।
- দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী। দেশটিতে গত বছর প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো খাতে গুগলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে আফ্রিকার কয়েকটি দেশও বাংলাদেশের তুলনায় বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে।
- মোজাম্বিক পেয়েছে ৫৬৯ কোটি ডলার, যেখানে হাইড্রোকার্বন ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ হয়েছে।
- ইথিওপিয়ায় এসেছে ৩৮০ কোটি ডলার। দেশটি নতুন প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগ এবং সার কারখানাসহ উৎপাদনমুখী শিল্পে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
- উগান্ডা পেয়েছে ৩৩৬ কোটি ডলার, যার বড় অংশ এসেছে তেল শোধনাগার ও ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রকল্পে।
- ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে এসেছে ১৮৭ কোটি ডলার, যেখানে খনিজ সম্পদ আহরণই বিনিয়োগের প্রধান উৎস।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন (এক লাখ ৬০ হাজার কোটি) ডলারে পৌঁছেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি সব অঞ্চলে সমান ছিল না।
উন্নত অর্থনীতিতে এফডিআই বেড়েছে ১১ শতাংশ, অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ। বিশ্বের শীর্ষ ২০টি অর্থনীতি মোট বৈশ্বিক এফডিআইয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আকর্ষণ করেছে। অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে বিনিয়োগ ২১ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছালেও, বৈশ্বিক এফডিআইয়ের মধ্যে তাদের অংশ মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ।

