দেশে শিল্প ও সেবা খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ হলেও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কৃষির গুরুত্ব কমেনি। খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামীণ কর্মসংস্থান, মানুষের আয় এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বড় অংশ এখনো কৃষিকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০২৬’ সেই চিত্রই তুলে ধরেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান বর্তমানে ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ। একই সঙ্গে এই খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৮ লাখ ৭০ হাজার। ফলে শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ সত্ত্বেও কৃষি এখনো দেশের বৃহত্তম কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে কৃষির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিবিএসের বর্ষগ্রন্থে কৃষি খাতের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন, আবাদি জমি, ফলন, মৎস্য, গবাদিপশু, বনসম্পদ, ভূমি ব্যবহার, কৃষি উপকরণ, আবহাওয়ার প্রভাব এবং কৃষিপণ্যের আমদানি-রপ্তানিসহ বিভিন্ন বিষয়ের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাজার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা এবং বাস্তবভিত্তিক কৃষিনীতি প্রণয়নের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
বর্ষগ্রন্থে দেশের ১৪৬টি প্রধান ও অপ্রধান ফসলের আবাদ, উৎপাদন এবং ফলনের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আউশ, আমন, বোরো, গম, আলু ও পাটের সর্বশেষ দুই বছরের তথ্য রয়েছে। এছাড়া আরও ১৪০টি অপ্রধান ফসলের তিন বছরের তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, কৃষিশ্রমিকের মজুরি, সেচব্যবস্থা, বীজ এবং সার ব্যবহারের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের কৃষি উৎপাদন মূলত খরিফ ও রবি—এই দুই মৌসুমকে ঘিরে আবর্তিত হয়। খরিফ মৌসুমে ধানসহ বর্ষাকালীন ফসল এবং রবি মৌসুমে গম, আলু, ডাল ও তেলবীজের মতো শীতকালীন ফসল উৎপাদিত হয়। দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি অর্থনীতিতে এই দুই মৌসুমের অবদান সবচেয়ে বেশি।
ফসল উৎপাদনের হিসাব নির্ধারণে বিবিএস মাঠপর্যায়ের সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং কৃষকদের সাক্ষাৎকার থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করেছে। প্রধান ফসলের ক্ষেত্রে উভয় উৎসের তথ্য যাচাই করে চূড়ান্ত উৎপাদনের হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত নমুনা জরিপ এবং কৃষি শুমারির তথ্যও এতে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রকাশনায় দেশের ৩০টি কৃষি-বাস্তুতান্ত্রিক অঞ্চলের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাটির ধরন, ভূপ্রকৃতি এবং কৃষি সম্ভাবনার ভিত্তিতে এসব অঞ্চল নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় জমিকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে, যাতে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং উপযোগী ফসল নির্বাচন সহজ হয়।
বিবিএসের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওবায়দুল ইসলাম বলেন, কৃষি খাতের অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অপরিহার্য। তিনি জানান, বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো সংগ্রহ করা সব সময় সম্ভব না হলেও সেগুলো পুনর্গঠন করে প্রকাশনায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মিজানুর রহমানের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাই শুধু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও দীর্ঘমেয়াদি এবং সুপরিকল্পিত কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

