বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প এখন একসঙ্গে একাধিক সংকটের মুখোমুখি। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রধান রপ্তানি বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্পটির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব চ্যালেঞ্জ দীর্ঘায়িত হলে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত আরও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম।
উপখাতভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, নিট পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে ২০ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ কমে হয়েছে ১৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। তবে পুরো অর্থবছরের চিত্র নেতিবাচক হলেও জুন মাসে কিছুটা আশার ইঙ্গিত মিলেছে। ওই মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে।
নিট পোশাক প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ বাজারেই এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানিতে।
তার ভাষ্য, আগের সরকারের সময় অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে কর্মসংস্থান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে সরকারের সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি।
শিল্পসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে জ্বালানির সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডারও কমেছে। এই দুই চাপের কারণে অনেক কারখানাই এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পোশাক কারখানা সরাসরি বিদেশি ক্রয়াদেশের ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই কার্যকর মূলধনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে অর্ডার কমে গেলে দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড গড়ে তোলার সক্ষমতা এখনো সীমিত। একইভাবে বিদেশের খুচরা বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগও তুলনামূলক কম। এ কারণে নতুন বাজারে অবস্থান শক্ত করতে সময় লাগছে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তারা পোশাক কেনায় আগের তুলনায় কম ব্যয় করছেন, যা রপ্তানিতে প্রভাব ফেলছে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং দেশের জ্বালানি সংকট থেকে। লোহিত সাগর হয়ে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় অনেক জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে। এতে কাঁচামাল আমদানি ও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।
তিনি জানান, দীর্ঘ রুট ব্যবহারের কারণে জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়াও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে উৎপাদক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতা—উভয় পক্ষের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। উৎপাদন সচল রাখতে অনেক কারখানাকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো। স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থা, উন্নত বাণিজ্যিক সুবিধা এবং কূটনৈতিক সক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক অনেক ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে এসব দেশে দিচ্ছেন। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুবিধার কারণে ভিয়েতনাম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দীর্ঘদিনের শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। বিশ্লেষকদের মতে, সেই বাস্তবতা মোকাবিলায় এখন থেকেই শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এদিকে ব্যবসা সহজ করতে শতভাগ কমপ্লায়েন্ট রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার জন্য প্রতি বছর বাধ্যতামূলক বন্ড অডিটের নিয়ম বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নিয়ম মেনে পরিচালিত কারখানাগুলোর প্রশাসনিক জটিলতা কিছুটা কমবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কার্বন ট্যাক্স আরোপ করলে রপ্তানিকারকদের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তার মতে, এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিবহনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ায় শিল্পের সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার আগেই ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের কারণে শিল্পটি চাপে ছিল। পরে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, পোশাকশিল্প বর্তমানে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি নানা কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং ডলার সংকট শিল্পটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ উৎপাদন ব্যাহত করছে। পাশাপাশি কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে পরিবেশ, শ্রমমান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছে। তাই শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে জ্বালানি নিরাপত্তা, নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

